রাজশাহীতে জেঁকে বসেছে হাড়কাঁপানো শীত। গত কয়েকদিন ধরে উত্তরের হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশার দাপটে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে পদ্মা পাড়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। দিনে সূর্যের দেখা মিললেও তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না, ফলে দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান কমে আসায় শীতের তীব্রতা অনুভূত হচ্ছে বহুগুণ বেশি। এই চরম আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ।
কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাজশাহী ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস
শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সকাল থেকেই ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা ছিল পুরো রাজশাহী জেলা। দৃষ্টিসীমা কমে আসায় মহাসড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল করছে হেডলাইট জ্বালিয়ে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ভোর ৬টায় রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা (Lowest Temperature) রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ছিল চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন রেকর্ড।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম জানান, উত্তরাঞ্চলে শীতের প্রকোপ আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। কুয়াশার দাপট কমে এলে এই অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ (Cold Wave) শুরু হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
থমকে গেছে চেনা ছন্দ: ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনে প্রভাব
তীব্র শীতের প্রভাবে রাজশাহীর ব্যস্ততম সড়কগুলো এখন অনেকটাই জনশূন্য। বিশেষ করে রাত ৮টার পর থেকেই নগরীতে মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ছে। ১০টার পর পুরো নগরী কার্যত একটি ভূতুড়ে জনপদে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শীতকালীন ছুটি চলায় এবং তীব্র ঠান্ডার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
ভদ্রা মোড়ের দোকানি খোরশেদ আলম জানান, "রাজশাহী মূলত ছাত্রছাত্রীনির্ভর শহর। ডিসেম্বরের ছুটিতে শহর এমনিতেই ফাঁকা থাকে, তার ওপর এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।"
সংকটে শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষ
প্রচণ্ড ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট সইছেন তারা, যাদের জীবন কাটে খোলা আকাশের নিচে বা বস্তিতে। অটোরিকশাচালক থেকে শুরু করে দিনমজুর—সবার আয় কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। অটোরিকশাচালক লোকমান আলী তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, "সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘন কুয়াশা থাকে। রোদ না উঠলে মানুষ রাস্তায় বের হয় না। যাত্রী না থাকায় আয়-ইনকাম তলানিতে ঠেকেছে। সংসার চালানোই এখন দায় হয়ে পড়েছে।"
ফুটপাতে শীতবস্ত্রের বাজার জমজমাট
তীব্র শীতের হাত থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষ এখন গরম কাপড়ের দোকানে ভিড় করছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে ফুটপাতের দোকানগুলো। জ্যাকেট, সোয়েটার এবং কম্বলের চাহিদা গত কয়েক দিনে কয়েক গুণ বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তীব্র শীতের কারণে বেচাকেনা বেড়েছে ঠিকই, তবে দীর্ঘ সময় কুয়াশা ও ঠান্ডার কারণে বিক্রেতাদেরও কষ্টের সীমা নেই।
প্রশাসনের পদক্ষেপ ও জনসচেতনতা
আকস্মিক এই শীতের প্রকোপে জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে ঠান্ডাজনিত রোগ যেমন—নিউমোনিয়া, অ্যাজমা ও সর্দিকাশির প্রকোপ বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শীতার্তদের মধ্যে কম্বল বিতরণের উদ্যোগ নিলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) প্রভাবে ঋতুচক্রের এই আচরণ আগামী কয়েক দিনে আরও কঠোর হতে পারে।