মিয়ানমারে বহুল আলোচিত সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের তোড়জোড় চললেও পর্দার আড়ালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গণতন্ত্রের পথে ফেরার দোহাই দিয়ে জান্তা সরকার একদিকে ভোটের প্রচার চালাচ্ছে, অন্যদিকে দেশজুড়ে বিদ্রোহী দমনের নামে শুরু করেছে নজিরবিহীন সামরিক অভিযান। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের নির্দেশে সামরিক তৎপরতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা গৃহযুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশেষ করে নৌবাহিনীকে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে নামানোর ঘোষণা এবং বিদ্ৰোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকা পুনর্দখলে তাদের মরিয়া মনোভাব নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নৌবাহিনীর নতুন ভূমিকা: জল ও স্থলের সমন্বিত যুদ্ধ কৌশল
গত বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) মিয়ানমার নৌবাহিনীর ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দেন। তিনি নৌবাহিনীকে কেবল জলপথ পাহারা নয়, বরং সেনা পরিবহন, ভারী গোলাবর্ষণ এবং স্থলযুদ্ধে সরাসরি সহায়তার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহীদের হামলায় স্থলপথের নিয়ন্ত্রণ হারানো জান্তা এখন নদীপথ ও উপকূলীয় এলাকাকে তাদের Strategic সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। একইসঙ্গে জান্তা সরকার রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে নৌ-সহযোগিতা (Naval Cooperation) বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের সামরিক শক্তিকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
বামার হার্টল্যান্ডে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি: আকাশপথে জান্তার তান্ডব
গত এক সপ্তাহে মিয়ানমারের বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী বামার অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে জান্তা বাহিনীর হামলা বহুগুণ বেড়েছে। সাগাইং, ম্যাগওয়ে এবং মান্দালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে প্রায় ৪০টিরও বেশি বিমান হামলা (Air Strike) চালানো হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীর তথ্যমতে, জান্তা বাহিনী কেবল বিদ্রোহী দমনেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, লুটপাট এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচার গোলাবর্ষণের মতো নীতি গ্রহণ করেছে। এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে জান্তার অস্তিত্ব সংকটে পড়া, তাই নির্বাচনের আগে এই এলাকাগুলো পুনর্দখলে তারা সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করছে।
পয়েন্ট ৬৬৬ ও অস্ত্র কারখানার সুরক্ষা: জান্তার মরণপণ লড়াই
বাগো অঞ্চলের পাদাউং টাউনশিপে অবস্থিত জান্তা সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র কারখানা (Arms Factory) এখন হুমকির মুখে। এই কারখানার নিরাপত্তার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘পয়েন্ট ৬৬৬’ (Point 666) পাহাড়টি বর্তমানে শক্তিশালী বিদ্ৰোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (Arakan Army) দখলে রয়েছে। এই পাহাড়টি পুনর্দখল করতে গিয়ে গত কয়েক দিনে জান্তার অন্তত অর্ধশতাধিক সেনা নিহত হয়েছে।
আরাকান আর্মির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দাবি করছে, শত শত জান্তা সেনা সাঁজোয়া যান ও আকাশপথের সুরক্ষা নিয়ে আক্রমণ চালালেও বিদ্রোহীদের শক্ত প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। রাখাইন ইয়োমা পর্বতপথ এবং ম্যাগওয়ের পাহাড়ি এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় জান্তা সেখানে প্রায় এক হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে। মূলত নিজেদের সামরিক রসদ তৈরির কারখানাটি বিদ্রোহীদের হাত থেকে রক্ষা করাই এখন জান্তার জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচন বনাম সামরিক বৈধতা: নেপথ্যের রাজনীতি
প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনের আগে কেন এই ভয়াবহ যুদ্ধংদেহী মনোভাব? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিন অং হ্লাইং একটি ‘নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন’ করতে চান যেখানে বিরোধীদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। কিন্তু দেশের অর্ধেকের বেশি এলাকা এখন বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। এই অবস্থায় নির্বাচন আয়োজন করলে জান্তার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই ভোটের আগে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হারানো ভূখণ্ড উদ্ধার এবং বিদ্রোহীদের মনোবল ভেঙে দেওয়াই জান্তার মূল লক্ষ্য।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। জান্তা বাহিনী যতই মরিয়া হয়ে উঠছে, বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ ততই তীব্র হচ্ছে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট আর অন্যদিকে চতুর্মুখী সামরিক চাপ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে মিয়ানমার এখন এক চরম অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে।