খাদ্যাভ্যাস কেবল রসনাতৃপ্তির বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার মূল চাবিকাঠি। মানুষের রুচি ও পছন্দের ওপর ভিত্তি করে কেউ বেছে নেন নিরামিষ (Vegetarian), কেউবা পশুজাত পণ্য বর্জিত ‘ভেগান’ (Vegan) ডায়েট। আবার বড় একটি অংশ আমিষ ও নিরামিষের মেলবন্ধনে বিশ্বাসী। কিন্তু হাড়ের গঠন এবং দীর্ঘস্থায়ী শক্তির ক্ষেত্রে কোন ধরনের ডায়েট সবচেয়ে কার্যকর? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য, যা নিরামিষভোজীদের জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
অক্সফোর্ড ও ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা
হাড়ের সুস্থতায় খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব বুঝতে অক্সফোর্ড ও ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে একটি যৌথ গবেষণা চালিয়েছে। প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের ওপর চালানো এই বিস্তৃত সমীক্ষায় (Study) দেখা গেছে, যারা শতভাগ নিরামিষ খাবার খান, তাদের হাড়ের সমস্যা হওয়ার প্রবণতা আমিষভোজীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এমনকি তাদের হাড় ভেঙে যাওয়ার বা ফ্র্যাকচার (Fracture) হওয়ার আশঙ্কাও বহুগুণ বেশি বলে গবেষণায় দাবি করা হয়েছে।
কেন নিরামিষভোজীদের হাড় তুলনামূলক দুর্বল?
গবেষণা চলাকালীন দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে যে, নিরামিষ এবং আমিষ ডায়েট শরীরের কাঠামোতে কীভাবে প্রভাব ফেলে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নাফিল্ড ডিপার্টমেন্ট অফ পপুলেশন হেলথ-এর নিউট্রিশনাল এপিডেমিওলজিস্ট (Nutritional Epidemiologist) ডক্টর ট্যামি টং এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, যারা পশুজাত কোনো খাবারই খান না বা সম্পূর্ণ নিরামিষাশী, তাদের কবজি, হিপ (Hip), গোড়ালি ও পায়ের হাড় ভাঙার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
এর প্রধান কারণ হিসেবে দুটি উপাদানের ঘাটতিকে দায়ী করেছেন গবেষকরা— ক্যালসিয়াম (Calcium) এবং প্রোটিন (Protein)। পশুজাত খাবারে এই দুটি উপাদান প্রচুর পরিমাণে থাকলেও নিরামিষ ডায়েটে এদের সঠিক ব্যালেন্স বজায় রাখা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ভেগানদের শরীরে এই দুই উপাদানের মাত্রা এতটাই কম থাকে যে, তাদের অস্থি বা হাড় ক্রমশ ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও ভিন্ন মত
যেকোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতোই এই গবেষণাতেও কিছু সীমাবদ্ধতা বা জটিলতা খুঁজে পেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণায় দেখা গেছে যে, নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হয়নি কোন হাড় ভাঙার ঘটনা পড়ে গিয়ে হয়েছে আর কোনটি দুর্ঘটনাবশত। এছাড়া আরেকটি বড় দিক হলো— এই সম্পূর্ণ সমীক্ষাটি চালানো হয়েছে শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়দের ওপর।
পুষ্টিবিদদের মতে, বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস এবং খনিজ ঘনত্ব (Bone Mineral Density) আলাদা হয়। জাতিভেদে বা ভৌগোলিক অবস্থানভেদে হাড়ের গঠন ও সহনশীলতা ভিন্ন হতে পারে। তাই এই ফলাফলকে এখনই ধ্রুব সত্য ধরে না নিয়ে বিভিন্ন জাতি, অঞ্চল এবং লিঙ্গভেদে আরও ব্যাপকভিত্তিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাড় মজবুত রাখতে করণীয়
গবেষণাটি নিরামিষভোজীদের সতর্ক করলেও এটি প্রমাণ করে না যে নিরামিষ ডায়েট অস্বাস্থ্যকর। বরং এটি নির্দেশ করে যে, যারা নিরামিষ খান তাদের ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের জোগানে বাড়তি সচেতনতা প্রয়োজন। উদ্ভিদজাত উৎস যেমন— সয়া পণ্য, ডাল, বাদাম, সবুজ শাকসবজি এবং প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের মাধ্যমে হাড়ের শক্তি (Bone Strength) বজায় রাখা সম্ভব।
সর্বোপরি, আপনি আমিষাশী হোন বা নিরামিষাশী— হাড়ের খনিজ ঘনত্ব ঠিক রাখতে নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সুষম খাবারের সমন্বয়ই সুস্থ জীবনের মূল মন্ত্র।