ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী জিলা স্কুলের ১৮৫ বর্ষ উদ্যাপন ও পুনর্মিলনীর বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিষাদের সুর নেমে এসেছে। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সমাপনী রজনীর প্রধান আকর্ষণ, দেশখ্যাত ব্যান্ড তারকা জেমসের (Nagar Baul) কনসার্ট চলাকালীন বহিরাগতদের অতর্কিত হামলায় পুরো অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়। ইট-পাটকেলের আঘাতে শিক্ষার্থী ও আয়োজক কমিটির বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তার স্বার্থে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অনুষ্ঠানটি বাতিল ঘোষণা করা হয়।
আকাঙ্ক্ষিত জেমসের কনসার্ট ও বহিরাগতদের বিশৃঙ্খলা
১৮৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠের ১৮৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী জমকালো আয়োজন ছিল স্কুল চত্বরে। সমাপনী দিনের মূল আকর্ষণ হিসেবে মঞ্চে ওঠার কথা ছিল 'নগর বাউল' জেমসের। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে স্কুলের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের জন্য ভেতরে আসন বরাদ্দ থাকলেও, বাইরে থাকা হাজারো সংগীতপ্রেমীর জন্য বড় পর্দায় (Large Screen) অনুষ্ঠান দেখার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু একদল বহিরাগত জোরপূর্বক মূল ভেন্যুতে (Venue) প্রবেশের চেষ্টা করলে গোলযোগের সূত্রপাত হয়।
ইট-পাটকেল বৃষ্টি ও লঙ্কাকাণ্ড
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অনুষ্ঠান শুরুর আগমুহূর্তে একদল উশৃঙ্খল যুবক নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। স্বেচ্ছাসেবীরা বাধা দিলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে প্যান্ডেল লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এতে জিলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও আয়োজকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান শামীম মঞ্চ থেকে বারবার শান্ত থাকার অনুরোধ জানালেও হামলা থামেনি। শেষ পর্যন্ত রাত ১০টার দিকে জেলা প্রশাসনের সরাসরি নির্দেশে অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়।
প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন ও ক্ষোভ
অনুষ্ঠানস্থলে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, জিলা স্কুল প্রাঙ্গণের অতি নিকটেই জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও পুলিশ লাইন্স অবস্থিত। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে বিপুল জনসমাগম সত্ত্বেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা (Security Protocol) কেন ছিল না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। বিশৃঙ্খলা চলাকালীন প্রশাসনের ‘প্যাসিভ’ বা নীরব ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কঠোর ‘Crowd Control’ ব্যবস্থা থাকলে এমন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।
ঐতিহ্যের স্মারকে আঘাত
ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ফরিদপুর জিলা স্কুল এই অঞ্চলের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান। ১৮৫ বছরের দীর্ঘ পথচলায় বহু মণীষীর জন্ম দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। পুনর্মিলনীর প্রচার ও মিডিয়া উপ-কমিটির আহ্বায়ক রাজীবুল হাসান খান আক্ষেপ করে বলেন, "আমাদের সব প্রস্তুতি ছিল নিশ্ছিদ্র। কিন্তু বহিরাগতদের তাণ্ডব সব আনন্দ ধুলোয় মিশিয়ে দিল। জেমসের মতো একজন কিংবদন্তি শিল্পীর লাইভ পারফরম্যান্স (Live Performance) বাতিল করতে হওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক।"
উৎসবের শুরু যেভাবে
এর আগে গত ২৫ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) সকালে বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা, ঘোড়ার গাড়ি ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়েছিল। চ্যানেল ২৪ (Channel 24) এই ঐতিহাসিক আয়োজনের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে যুক্ত ছিল। দুই দিনের এই মিলনমেলায় প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আড্ডায় যে প্রাণের স্পন্দন তৈরি হয়েছিল, তা শেষ মুহূর্তে ম্লান হয়ে গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত অরাজকতায়।
উপসংহার
ফরিদপুর জিলা স্কুলের এই ঘটনাটি আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। ঐতিহ্যের এই পুনর্মিলনী উৎসব স্মরণীয় হয়ে থাকার কথা ছিল আনন্দের জন্য, কিন্তু তা শেষ হলো এক দুঃসহ স্মৃতির মধ্য দিয়ে।