গ্যাস্ট্রিক বা গ্যাস্ট্রাইটিস—বাঙালি জনজীবনে এক অতি পরিচিত বিভীষিকার নাম। এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া দায়, যেখানে কেউ এই সমস্যায় ভুগছেন না। আমাদের পাকস্থলীর ভেতরের দেয়ালে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ঝিল্লি বা ‘মিউকাস মেমব্রেন’ থাকে, যা মূলত খাবারের অ্যাসিড ও ক্ষতিকর জীবাণু থেকে পাকস্থলীকে রক্ষা করে। যখনই আমাদের ভুল জীবনযাত্রার (Lifestyle) কারণে এই সুরক্ষাকবচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখনই অ্যাসিডের সংস্পর্শে পেটে শুরু হয় তীব্র জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি। তবে জানেন কি, কেবল ওষুধ খেয়ে নয়, বরং দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমেই এই ‘অ্যাসিডিটি’র সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব?
নিচে এমন ৫টি অভ্যাসের কথা আলোচনা করা হলো যা আপনার হজমপ্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে:
১. নেশা ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন: পাকস্থলীর প্রধান শত্রু
ধূমপান এবং অ্যালকোহল গ্রহণ কেবল সামাজিক ব্যাধিই নয়, এটি আমাদের ‘ডাইজেস্টিভ মিউকাস’ বা পরিপাক ঝিল্লিকে সরাসরি ধ্বংস করে দেয়। ফলে পাকস্থলী তার স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারায়। একই কাজ করে অতিরিক্ত চা বা কফিতে থাকা ক্যাফেইন। এছাড়া অতিরিক্ত ঝাল, আদা, সর্ষে কিংবা চিনিযুক্ত খাবার এই প্রদাহকে আরও ত্বরান্বিত করে। গ্যাস্ট্রিক থেকে বাঁচতে এই ধরণের টক্সিন (Toxins) গ্রহণ থেকে নিজেকে বিরত রাখা জরুরি।
২. খাবারের সময়ের অনিয়ম ও মেটাবলিজম
আমাদের শরীরের ভেতর একটি জৈবিক ঘড়ি কাজ করে। নির্দিষ্ট সময়ে খাবার না খেলে পাকস্থলীতে নিঃসরিত অ্যাসিড কোনো খাদ্য না পেয়ে পাকস্থলীর দেয়ালকেই ক্ষয় করতে থাকে। পুষ্টিবিদদের মতে, সুস্থ থাকার জন্য একবারে অনেক বেশি না খেয়ে সারা দিনে পাঁচবারে অল্প অল্প করে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা উচিত। এতে আপনার মেটাবলিজম (Metabolism) উন্নত হয় এবং হজমপ্রক্রিয়া সাবলীল থাকে।
৩. দ্রুত খাবার গেলা: পাকস্থলীর ওপর বাড়তি চাপ
সময়ের অভাবে অনেকেই তাড়াহুড়ো করে খাবার খান, যা শরীরের জন্য চরম ক্ষতিকর। মনে রাখবেন, পরিপাক বা ডাইজেশন প্রক্রিয়া শুরু হয় মুখ থেকেই। খাবার ঠিকমতো না চিবিয়ে গিলে ফেললে পাকস্থলীকে সেই শক্ত খাবার ভাঙতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং বেশি মাত্রায় অ্যাসিড নিঃসরণ করতে হয়। খাওয়ার সময় কথা বলা কিংবা মোবাইল ব্যবহারের মতো ডিস্ট্রাকশন এড়িয়ে পুরোপুরি খাবারের ওপর মনোযোগ দেওয়া উচিত।
৪. হরেক পদের সমাহার ও ফলের ভুল ব্যবহার
একসঙ্গে অনেক ধরনের গুরুপাক খাবার খাওয়ার অভ্যাস গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার অন্যতম কারণ। অনেকেই মূল খাবারের সাথে সাথে বা পরপরই ফল খেয়ে থাকেন। এটি স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও ভালো নয়। ফল খুব দ্রুত হজম হয়, কিন্তু মূল খাবার হজম হতে সময় নেয়। ফলে দুটি একসাথে খেলে পেটে গেঁজিয়ে উঠে গ্যাস সৃষ্টি হয়। মূল খাবার এবং ফল খাওয়ার মধ্যে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের বিরতি রাখা বাঞ্চনীয়।
৫. খাওয়ার পরপরই জল পানের কুফল
অনেকেরই অভ্যাস থাকে এক লোকমা খাবারের সাথে এক ঢোক জল পান করা। এটি হজমপ্রক্রিয়ার বড় অন্তরায়। খাবার খাওয়ার পরপরই আমাদের পাকস্থলীতে প্রাকৃতিক হজম রস বা ‘ডাইজেস্টিভ এনজাইম’ (Digestive Enzymes) নিঃসৃত হয়। ওই সময় পেটে অতিরিক্ত জল প্রবেশ করলে সেই রস পাতলা হয়ে যায় এবং কার্যকারিতা হারায়। ফলে খাবার সঠিকভাবে হজম না হয়ে অ্যাসিডিটি ও বুকে জ্বালাপোড়া তৈরি করে। তাই খাবার খাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট পর জল পান করার অভ্যাস করুন।
পরিশোধিত জীবনযাত্রা এবং খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন আনলেই গ্যাস্ট্রিকের মতো কষ্টদায়ক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সুস্থ থাকতে আজই এই বদঅভ্যাসগুলো ত্যাগ করুন।