দেশের বাজারে স্বর্ণের দামের লাগামহীন দৌড়ে অবশেষে বিরতি পড়ল। টানা আটবার বাড়ার পর মূল্যবান এই ধাতুর দাম এক ধাক্কায় ভরিতে আড়াই হাজার টাকার বেশি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫) থেকে সারা দেশে নতুন এই দাম কার্যকর হচ্ছে, যা সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে।
স্বর্ণের বাজারে বড় সংশোধন
সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) রাতে বাজুস-এর মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির এক বিজ্ঞপ্তিতে এই মূল্য হ্রাসের তথ্য জানানো হয়। সংগঠনটি জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (Pure Gold) দর সংশোধিত হওয়ায় এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন এই ‘Price Adjustment’ করা হয়েছে। এবারের সিদ্ধান্তে সবথেকে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ভরিতে ২ হাজার ৫০৮ টাকা কমানো হয়েছে।
ক্যারেট অনুযায়ী স্বর্ণের নতুন মূল্যতালিকা
বাজুস নির্ধারিত নতুন মূল্যসূচি অনুযায়ী, আজ থেকে বাজারে চার ক্যাটাগরির স্বর্ণ নিচের দামে বিক্রি হবে:
১. ২২ ক্যারেট: প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ২৬ হাজার ৯২৩ টাকা। গতকাল পর্যন্ত যা ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৩১ টাকা। ২. ২১ ক্যারেট: প্রতি ভরি বিক্রি হবে ২ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ টাকায়। ৩. ১৮ ক্যারেট: নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯১ টাকা। ৪. সনাতন পদ্ধতি: প্রতি ভরি স্বর্ণ কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হবে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭২৩ টাকা।
অতিরিক্ত চার্জ ও ভ্যাট কাঠামো
বাজুস স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নির্ধারিত এই বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট (VAT) এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি (Making Charge) আবশ্যিকভাবে যুক্ত করতে হবে। তবে গহনার ডিজাইন এবং মানভেদে মজুরির হারে তারতম্য হতে পারে। ফলে গহনা কেনার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত দাম নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কিছুটা বেশি হবে।
রেকর্ড ভাঙার পর নিম্নমুখী প্রবণতা
এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর স্বর্ণের দাম বাড়িয়ে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল বাজুস। তখন ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৩১ টাকায়। গত ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই রেকর্ড দামেই স্বর্ণ বিক্রি হয়েছে। টানা ৮ বার দাম বাড়ার পর এই প্রথম বড় ধরনের পতনের মুখ দেখল স্বর্ণের বাজার।
২০২৫: অস্থির এক বছর
চলতি ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে চরম অস্থিরতা লক্ষ করা গেছে। বছরের শেষ প্রান্তিকে এসে দেখা যাচ্ছে, এ বছর মোট ৯২ বার স্বর্ণের দাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং মাত্র ২৮ বার দাম কমানো হয়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালেও মোট ৬২ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যা এ বছরের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ চলতি বছরে স্বর্ণের বাজার আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয়—উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত ‘Volatile’ ছিল।
রুপার বাজার স্থিতিশীল
স্বর্ণের দামে বড় পরিবর্তন এলেও রুপার বাজারে কোনো প্রভাব পড়েনি। দেশের বাজারে রুপার দাম আগের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ক্যাটাগরি অনুযায়ী রুপার দাম নিচে দেওয়া হলো:
২২ ক্যারেট: প্রতি ভরি ৬,০৬৫ টাকা।
২১ ক্যারেট: প্রতি ভরি ৫,৭৭৪ টাকা।
১৮ ক্যারেট: প্রতি ভরি ৪,৯৫৭ টাকা।
সনাতন পদ্ধতি: প্রতি ভরি ৩,৭৩২ টাকা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিনিময় হার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতার প্রভাবেই স্থানীয় বাজারে স্বর্ণের দামে এই রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলা চলছে। আজকের এই দর পতন সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বিয়ের মৌসুমে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।