মিয়ানমারে চার বছর আগে রক্তক্ষয়ী এক সামরিক অভ্যুত্থান বা Coup-এর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা জান্তা সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের প্রথম ধাপে জয়ের দাবি করেছে সেনাবাহিনী সমর্থিত রাজনৈতিক দল। প্রভাবশালী দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) দাবি করেছে, তারা বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনকে স্রেফ একটি ‘রাজনৈতিক মহড়া’ এবং প্রহসন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বন্দুকের নলে ব্যালট যুদ্ধ: আতঙ্কে ভোটকেন্দ্র
গত ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর দুই দিনব্যাপী মিয়ানমারের প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানী নেপিদোতে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং নিজে ভোট দিয়ে জনগণকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তবে বাস্তবে ইয়াঙ্গুন এবং মান্দালয়ের মতো বড় শহরগুলোতে কোনো নির্বাচনী আমেজ ছিল না। রাস্তাঘাট ছিল জনশূন্য, দোকানপাট বন্ধ এবং ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল কার্যত ভোটারহীন।
মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, নাগরিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নয়, বরং জান্তার রোষানল এবং গ্রেফতারের ভয়ে ভোট দিতে গেছেন। ভোটকেন্দ্রগুলোর চারপাশে মোতায়েন ছিল ভারী অস্ত্রধারী সেনা ও সাদাপোশাকের গোয়েন্দা বাহিনী। মান্দালয়ে ভোটের আগের রাতে সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীর রকেট হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা আরও কঠোর করা হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ভীতির সঞ্চার করে।
জান্তার ‘বেসামরিক’ হওয়ার ছক ও সাংবিধানিক মারপ্যাঁচ
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের মূল লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার নয়, বরং মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বের জান্তা সরকারকে একটি ‘বেসামরিক’ রূপদান করা। ২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী, মিয়ানমারের পার্লামেন্টে এমনিতেই ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকে। এর ওপর যদি জান্তাপন্থি ইউএসডিপি নির্বাচনে বড় জয় পায়, তবে সামরিক জেনারেলদের হাতেই থাকবে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ।
এই কৌশলী নির্বাচনের মাধ্যমে জান্তা প্রধান নিজেকে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করতে চান। এর ফলে দেশে জারি করা দীর্ঘকালীন জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি তথাকথিত International Legitimacy বা বৈধতা আদায়ের চেষ্টা করবে সামরিক জান্তা।
আন্তর্জাতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক সমীকরণ
মিয়ানমারের এই বিতর্কিত নির্বাচন পর্যবেক্ষণে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে চীন, রাশিয়া এবং বেলারুশের মতো দেশগুলো। কাকতালীয়ভাবে এই দেশগুলোই বর্তমানে মিয়ানমার জান্তাকে ড্রোন, যুদ্ধবিমান এবং আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমা দেশগুলো এই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করলেও মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে ‘স্বীকৃতি’ পাওয়াই এখন জান্তার প্রধান কূটনৈতিক লক্ষ্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও Civil Society প্রতিনিধিদের মতে, সু চি সরকারকে হটিয়ে যে রক্তপাত জান্তা শুরু করেছিল, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তারা সেই কালো ইতিহাসকে আড়াল করতে চাইছে। তবে বিরোধীদের সক্রিয় প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের অনীহা জান্তার এই ‘নির্বাচনী নাটক’কে বিশ্বদরবারে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।