লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় নতুন ঘি ঢেলে ভেনেজুয়েলার ভেতরে সরাসরি ড্রোন হামলার (Drone Attack) কথা স্বীকার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি মাসের শুরুর দিকে ভেনেজুয়েলার কারাকাস উপকূলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন, যা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক সংঘাতকে এক ভয়াবহ সামরিক মোড় এনে দিয়েছে।
টার্গেট যখন ‘ট্রেন দ্য আরাগুয়া’: সিআইএ-র গোয়েন্দা ছক
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার কুখ্যাত অপরাধচক্র ‘ট্রেন দ্য আরাগুয়া’ (Tren de Aragua) এই বন্দরটিকে তাদের প্রধান মাদক মজুত ও পাচার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। এই ডক বা জেটি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ড্রোন ও স্পিডবোটের মাধ্যমে পাচার হতো বিপুল পরিমাণ মাদক। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ড্রোন হামলার মাধ্যমে সেই ‘নারকো-সাপ্লাই চেইন’ গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে পেন্টাগন।
হামলার বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, “ঐ বন্দরটি কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং নৌকায় মাদক বোঝাই করার জন্য ব্যবহার করা হতো। আমরা আমাদের সীমান্ত এবং নাগরিক রক্ষায় কোনো আপস করব না।”
অপারেশন ‘সাউদার্ন স্পিয়ার’ ও বেসামরিক হতাহত
এদিকে, ভেনেজুয়েলার ভেতরে হামলার পাশাপাশি পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরেও আগ্রাসি অভিযান অব্যাহত রেখেছে মার্কিন বাহিনী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (X) পোস্ট করে মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড (Southern Command) জানিয়েছে, সমরমন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে গঠিত জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স ‘সাউদার্ন স্পিয়ার’ (Southern Spear) আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানে হামলা চালিয়েছে। তবে এই অভিযানে অন্তত ২ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হওয়ায় মানবাধিকার নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাদক পাচার দমনের লক্ষ্যে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের এই চলমান সামরিক অভিযানের আওতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১০৭ জন নিহত হয়েছে। এর আগে গত ২২ ডিসেম্বরও একই অঞ্চলে মাদকবাহী সন্দেহে একটি নৌযানে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন ফোর্স।
মাদুরো সরকারের ওপর বাড়ছে চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন নানাভাবে মাদুরো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। সরাসরি দেশের ভেতরে ড্রোন হামলা চালানো সেই আগ্রাসী সামরিক কৌশলেরই একটি বহিঃপ্রকাশ। যদিও এর আগে ট্রাম্প একাধিকবার ভেনেজুয়েলায় হামলার হুমকি দিয়েছিলেন, তবে এবারই প্রথম তিনি সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পথ বেছে নিলেন।
গত সপ্তাহের এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি বড় স্থাপনা ধ্বংস করেছে যেখান থেকে মাদকবাহী জাহাজ আসত। যদিও সেই সময় সিআইএ এই অপারেশন সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি, তবে ড্রোন স্ট্রাইকের প্রমাণ পাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি জনসমক্ষে আনতে বাধ্য হয়।
তীব্র উত্তেজনার মুখে লাতিন আমেরিকা
ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে এই হামলার ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। মাদুরো সরকারের পক্ষ থেকে এই হামলাকে ‘সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন ড্রোন হামলার এই নতুন ট্রেন্ড দক্ষিণ আমেরিকার স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বীজ বপন করছে কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।