বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বিকেলে শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়। মায়ের এই অন্তিম বিদায়বেলায় দেশবাসীর অভূতপূর্ব ভালোবাসা আর উপস্থিতিতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, নিকটজন হারানোর গভীর শূন্যতা পেরিয়ে এখন পুরো বাংলাদেশই তাঁর পরিবার হয়ে উঠেছে।
‘তিনি ছিলেন সমগ্র জাতির মা’
ফেসবুক পোস্টের শুরুতেই তারেক রহমান অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় তাঁর মায়ের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি লেখেন, “গভীর শোক ও কৃতজ্ঞতায় ভাস্বর হয়ে আমি আমার প্রিয় মা, জীবনের প্রথম শিক্ষক, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আমার বাবা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করেছি। তাঁর অনুপস্থিতির শূন্যতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তবু, এই কঠিন মুহূর্তে দেশের মানুষের অভূতপূর্ব উপস্থিতি আমাকে একাকিত্বে ভুগতে দেয়নি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “লক্ষ-লক্ষ মানুষ একসাথে এসে যেভাবে সম্মান জানিয়েছে, তা আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে: তিনি শুধু আমার মা ছিলেন না; অনেক দিক থেকে, তিনি ছিলেন সমগ্র জাতির মা।”
স্বজন হারানোর বিষাদ ও বাংলাদেশের নতুন সংজ্ঞা
পরিবারের সদস্যদের হারানোর দীর্ঘ পরিক্রমায় তারেক রহমান আজ নিজেকে একা ভাবছেন না। শোকের এই মুহূর্তে তিনি তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং অকালপ্রয়াত ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যক্তিগত জীবনের আপনজনদের হারানোর যে হাহাকার তাঁর মনে ছিল, বাংলাদেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় তা আজ পূর্ণতা পেয়েছে। তারেক রহমানের ভাষায়, “আজ এত মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মনে হচ্ছে—নিকটজন হারানোর শূন্যতা পেরিয়ে, পুরো বাংলাদেশই আমার পরিবার হয়ে উঠেছে।”
বৈশ্বিক কূটনৈতিক সংহতি ও কৃতজ্ঞতা
বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ে কেবল দেশবাসীই নয়, আন্তর্জাতিক মহলের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। এ বিষয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শীর্ষ প্রতিনিধি (Top Representatives), বৈশ্বিক কূটনীতিক (Global Diplomats) এবং উন্নয়ন সহযোগীরা সশরীরে উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, যার জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। যেসব দেশ সমবেদনা প্রকাশ করেছে, তাদের প্রতিও আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনাদের এই সহমর্মিতা (Empathy) আমাদের হৃদয় গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে।”
উত্তরাধিকার বহন ও আগামীর মিশন
মায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং জনগণের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বেগম জিয়ার লড়াই যেখানে থেমেছে, সেখান থেকেই তিনি নতুন করে পথচলা শুরু করবেন। তিনি লেখেন, “আমার মা সারাজীবন নিরলসভাবে মানুষের সেবা করেছেন। আজ তাঁর সেই দায়িত্ব ও উত্তরাধিকার (Legacy) আমি গভীরভাবে অনুভব করছি। যেখানে আমার মায়ের পথচলা থেমেছে, সেখানে আমি চেষ্টা করব সেই পথযাত্রাকে এগিয়ে নিতে। সেই মানুষদের জন্য, যাদের ভালোবাসা ও বিশ্বাস তাঁকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শক্তি দিয়েছে।”
পোস্টের শেষাংশে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, বেগম জিয়ার ত্যাগ ও উদারতা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাই হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের শক্তি ও দেশপ্রেমের মূল উৎস।
লন্ডন থেকে পাঠানো এই বার্তায় তারেক রহমান কেবল একজন পুত্র হিসেবে নয়, বরং দলের শীর্ষ নেতৃত্ব (Leadership) হিসেবে জনগণের প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতার এক নতুন রূপরেখা তুলে ধরেছেন, যা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।