প্রকৃতির চরম রূপ: খরা কাটিয়ে বিপত্তি আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়ার অবসান ঘটিয়ে নামা তুষারপাত ও ভারী বৃষ্টিপাত এখন দেশটিতে মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে সৃষ্ট ‘Flash Flood’ বা আকস্মিক বন্যায় দেশজুড়ে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই দুর্যোগে আহত হয়েছেন আরও ১১ জন। আফগানিস্তানের ভঙ্গুর ‘Infrastructure’ বা অবকাঠামোর ওপর এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নতুন করে বড় ধরনের মানবিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
হেরাতে শোকের ছায়া: একই পরিবারের ৫ মৃত্যু বন্যার পাশাপাশি তুষারপাত ও বৃষ্টির কারণে ঘরবাড়ির ছাদ ধসে পড়ার ঘটনা ঘটছে। হেরাত প্রদেশের গভর্নরের মুখপাত্র মোহাম্মদ ইউসুফ সাঈদী জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) হেরাতের কাবকান জেলায় একটি বাড়ির ছাদ ধসে একই পরিবারের পাঁচজন সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুটি শিশুও রয়েছে। শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে ঘরে আশ্রয় নেওয়া এই পরিবারটি মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে। হেরাতসহ পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে তুষারপাতের ফলে জনজীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
আফগানিস্তান জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সতর্কতা আফগানিস্তান ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (ANDMA)-র মুখপাত্র মোহাম্মদ ইউসুফ হাম্মাদ জানিয়েছেন, গত সোমবার থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হতাহতের খবর আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মধ্য, উত্তর, দক্ষিণ এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে বন্যার দাপট সবচেয়ে বেশি। হাম্মাদ বলেন, “বন্যার ফলে বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। ১,৮০০-এর বেশি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গৃহপালিত পশু মারা যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে।” তিনি আরও জানান, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে দুর্যোগ মোকাবিলা করার সক্ষমতা এমনিতেই সীমিত, তার ওপর এই আকস্মিক দুর্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভাইরাল ভিডিও ও মহাসড়কের ভয়াবহতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘X’ (সাবেক টুইটার)-এ ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপে আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। হেরাত-কান্দাহার মহাসড়কের দাশত-ই বাকওয়ার কাছে বন্যার তীব্র স্রোতে একটি বিশাল ট্রাক উল্টে যেতে দেখা গেছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি যাত্রীবাহী বাস বন্যার তোড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেছে এবং যাত্রীরা প্রাণভয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। মহাসড়কগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় জরুরি ত্রাণ পৌঁছাতেও হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন।
জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক সংকট পরিবেশবিদরা মনে করছেন, ‘Climate Change’ বা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আফগানিস্তানে আবহাওয়ার এই চরমভাবাপন্ন আচরণ বাড়ছে। দীর্ঘ সময় খরা চলার পর হঠাৎ করে অতিবৃষ্টি ও তুষারপাত মাটির ধারণক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে ‘Flash Flood’ ও ভূমিধসের মতো ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, আফগানিস্তানে একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ—এই দ্বিমুখী সংকটে সাধারণ মানুষের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।