ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ছাত্র-জনতার বিপ্লবের অন্যতম সেনানী শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে এক অমোঘ ঘোষণা দিয়েছেন নৌপরিবহন এবং বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, হাদি হত্যার পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীরা যদি দেশের বাইরেও পালিয়ে থাকে, তবে তাদের আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ায় খুঁজে বের করে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে এবং আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) বিকেলে ঝালকাঠির নলছিটি লঞ্চঘাটের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি লঞ্চঘাট’ নামকরণের ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
হাদি হত্যার নেপথ্যে কারা? রহস্য উন্মোচন চলতি মাসেই
শহীদ হাদির হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে চলা উদ্বেগের মাঝে আশার বাণী শুনিয়েছেন নৌ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যারা কলকাঠি নেড়েছে, তাদের পরিচয় আর গোপন থাকবে না। আমরা নিবিড়ভাবে তদন্ত করছি এবং আশা করছি চলতি জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়েই পুরো বিষয়টি জাতির সামনে উন্মোচন করা হবে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, বিপ্লবীদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না এবং এই বিচার হবে দৃষ্টান্তমূলক।
বিপ্লবের গ্লোবাল আইকন: হাদি এখন বিশ্বজনীন
এম সাখাওয়াত হোসেন তার বক্তব্যে শহীদ হাদির ত্যাগের মহিমা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “হাদির নাম এখন আর কেবল নলছিটি বা বাংলাদেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। তার আত্মত্যাগ এবং আদর্শিক লড়াই তাকে এক ‘Global Icon’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পৃথিবী যতদিন থাকবে এবং মুক্তিকামী মানুষ যতদিন বিপ্লবীদের স্মরণ করবে, ততদিন হাদির নাম পরম শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হবে।”
নলছিটির কৃতি সন্তান হিসেবে হাদির স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এই লঞ্চঘাটের নামকরণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এটি মূলত তরুণ প্রজন্মের কাছে বিপ্লবের চেতনাকে চিরস্থায়ী করার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস।
‘সীমান্ত শরীফ’ থেকে শহীদ হাদি: একটি সংগ্রামের আখ্যান
অনুষ্ঠানে আবেগঘন বক্তব্য রাখেন শহীদ হাদির বোন মাছুমা হাদি। তিনি জানান, ফ্যাসিস্ট শাসনের ১৭ বছরের অন্ধকার সময়েও হাদি দমে যাননি। তিনি ‘সীমান্ত শরীফ’ ছদ্মনামে একটি ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে নিরন্তর প্রতিবাদ চালিয়ে যেতেন। মাছুমা বলেন, “হাদির মাথায় গুলি চালানো মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা করা নয়, এটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। যারা এই দুঃসাহস দেখিয়েছে, তাদের প্রকাশ্য আদালতে বিচার করতে হবে।”
নলছিটিতে বিচারের দাবিতে উত্তাল রাজপথ
উপদেষ্টার উপস্থিতিতেই অনুষ্ঠান চলাকালীন শহীদ হাদির সহকর্মী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ ব্যানার-ফেস্টুন হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের কণ্ঠে ছিল প্রিয় নেতার খুনিদের দ্রুততম সময়ে গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবি। স্থানীয়দের এই সেন্টিমেন্টকে সম্মান জানিয়ে নৌ উপদেষ্টা আশ্বস্ত করেন যে, বর্তমান সরকার ন্যায়ের পক্ষে এবং কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শহীদ হাদির নামে এই লঞ্চঘাটের নামকরণ এবং সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে খুনিদের ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ী শক্তির নৈতিক জয়ের প্রতিফলন।