দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে বাজছে যুদ্ধের দামামা। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ‘সামরিক আগ্রাসনের’ তীব্র নিন্দা ও কঠোর সমালোচনা করেছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, শনিবার (৩ জানুয়ারি, ২০২৬) মস্কোর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ওয়াশিংটনকে চরম সংযত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ক্যারিবিয়ানে রণসজ্জা ও সংঘাতের আশঙ্কা
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উত্তেজনা আর না বাড়িয়ে সংলাপের (Dialogue) মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ খুঁজে বের করা জরুরি। রাশিয়ার মতে, ওয়াশিংটনের এই একতরফা শক্তি প্রদর্শন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্যারিবিয়ান সাগর অঞ্চলে এক বিশাল সামরিক শক্তি (Military Force) মোতায়েন করেছে পেন্টাগন। এই বহরে রয়েছে একটি আধুনিক বিমানবাহী রণতরী (Aircraft Carrier), একাধিক বিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ (Warships) এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান। মূলত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই সমরসজ্জা বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
মাদক-রাষ্ট্র বনাম তেলের রাজনীতি
ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, মাদুরো প্রশাসন দেশটিকে একটি ‘মাদক-রাষ্ট্র’ (Narco-state) হিসেবে পরিচালনা করছে এবং গত বছরের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি (Election Fraud) করে ক্ষমতা দখল করে রেখেছে। তবে নিকোলাস মাদুরো এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে উল্টো দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত বিশ্বের বৃহত্তম ‘তেল মজুদের’ (Oil Reserves) নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।
মাদুরোর মতে, ওয়াশিংটন তাদের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে এবং ভেনেজুয়েলার সম্পদ লুট করতেই এই অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করছে। এদিকে, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনেক আগে থেকেই ভেনেজুয়েলায় স্থল অভিযান (Ground Intervention) চালানোর প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে, মাদুরোর জন্য সম্মানজনকভাবে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
আগ্রাসনের ইতিহাস ও রাশিয়ার হুঁশিয়ারি
সম্প্রতি প্রশান্ত মহাসাগর এবং ক্যারিবিয়ান সাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী, যাতে বেশ কিছু হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। রাশিয়া এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে সরাসরি ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে।
ক্রেমলিনের কূটনীতিকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের সামরিক প্রভাব বা Strategic Interest বজায় রাখতে অজুহাত হিসেবে মাদুরোকে ব্যবহার করছে। মস্কোর স্পষ্ট বার্তা—সংলাপ ছাড়া অন্য কোনো পথে সামরিক হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম (Oil Prices) ও Market Value নিয়ে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ গতিপথ
দক্ষিণ আমেরিকায় রুশ-মার্কিন এই প্রচ্ছন্ন লড়াই বা ‘প্রক্সি ওয়ার’ পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে নজর রাখছে সারাবিশ্ব। একদিকে ওয়াশিংটনের সামরিক আস্ফালন, অন্যদিকে মস্কোর কূটনৈতিক ঢাল—সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।