শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই আবারও এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। রবিবার (৪ জানুয়ারি) সকালে উপজেলার বিলাশপুর ইউনিয়নের বুধাইরহাট বাজারে স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে শতাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ককটেলের এই নারকীয় তাণ্ডবে জাবেদ শেখ (২০) নামের এক যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন, যার একটি হাত বিস্ফোরণে পুরোপুরি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে। এলাকায় বর্তমানে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশি তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও প্রাণহানির আশঙ্কা
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রবিবার সকাল থেকেই বুধাইরহাট বাজার এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। হঠাৎ করেই স্থানীয় প্রভাবশালী দুই গ্রুপ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ ককটেল নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ককটেলের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। একের পর এক বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারপাশ। বিস্ফোরণ চলাকালে জাবেদ শেখ নামের ওই যুবক ককটেলের আঘাতে মারাত্মক জখম হন। তার বাম হাতের কব্জি থেকে আঙুল পর্যন্ত অংশ বিস্ফোরণে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
দীর্ঘদিনের আধিপত্যের লড়াই ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিলাশপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান কুদ্দুস ব্যাপারী এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল জলিল মাদবরের সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধই এই সংঘর্ষের মূল কারণ। স্থানীয় সূত্র বলছে, এলাকায় নিজেদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বা Political Dominance বজায় রাখা এবং বাজারের Market Value নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে এই দুই গ্রুপের মধ্যে প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। রবিবারের এই সংঘর্ষে কুদ্দুস ব্যাপারীর পক্ষে মান্নান ব্যাপারী এবং আব্দুল জলিল মাদবরের পক্ষে নাসির ব্যাপারী নেতৃত্ব দেন বলে জানা গেছে। এর আগে শনিবার রাতেই বুধাইরহাট এলাকায় ৮-১০টি ককটেল ফাটিয়ে মহড়া দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা, যা রবিবার সকালে পূর্ণাঙ্গ সহিংসতায় রূপ নেয়।
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও সম্পদহানি
সংঘর্ষ চলাকালে কেবল ককটেল বিস্ফোরণই নয়, উত্তেজিত জনতা বুধাইরহাট বাজারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং দুটি বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক ব্যবসায়ী তাদের দোকানের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। স্থানীয় দোকানদাররা জানান, এ ধরনের সংঘাতের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকি বা Security Risk বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অতীতের সহিংসতা ও আইনি জটিলতা
জাজিরার এই এলাকাটি ককটেল বিস্ফোরণের জন্য আগেও কুখ্যাতি অর্জন করেছে। গত বছরের ৫ এপ্রিল এবং ২ নভেম্বর একই এলাকায় বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল, যা দেশজুড়ে আলোচিত হয়। ওই সময় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে করা মামলায় আব্দুল জলিল মাদবর বর্তমানে কারাগারে (Incarcerated) রয়েছেন। অন্যদিকে, চেয়ারম্যান কুদ্দুস ব্যাপারী জামিনে মুক্ত থাকলেও বর্তমানে এলাকাছাড়া। রবিবারের ঘটনার পর থেকে মূল হোতা মান্নান ব্যাপারী ও নাসির ব্যাপারী মোবাইল বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে গেছেন।
পুলিশি তৎপরতা ও আইনগত ব্যবস্থা
ঘটনার খবর পেয়ে জাজিরা থানা পুলিশের একটি বিশাল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহম্মদ গণমাধ্যমকে জানান, "বিলাশপুর ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে শতাধিক ককটেল বিস্ফোরণের খবর আমরা নিশ্চিত করেছি। জাবেদ শেখ নামে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আমরা ইতিমধ্যে অপরাধীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছি এবং Law Enforcement বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জনমনে আতঙ্ক দূর করতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।"
পুলিশ জানায়, এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের গ্রেফতার করতে ডিজিটাল সারভেইল্যান্স ও স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। দ্রুতই দোষীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।