দেশের অর্থনীতিতে প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (RMG) খাতের জন্য উদ্বেগজনক খবর। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং স্থানীয় অনিশ্চয়তার প্রভাবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ২.৬৩ শতাংশের পতন লক্ষ্য করা গেছে। বছরের শুরুতে রপ্তানির যে প্রবৃদ্ধির ধারা আশা করা হয়েছিল, ছয় মাসের চিত্রটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
রবিবার (৪ জানুয়ারি) রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (Export Promotion Bureau - EPB) হালনাগাদ তথ্যে এই নিম্নমুখী প্রবণতা উঠে এসেছে।
রপ্তানির মূল চিত্র: ৬ মাসের সামগ্রিক পতন
EPB-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশ মোট ১ হাজার ৯৩৬ কোটি ৫৪ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এর আগের অর্থবছরের (২০২৪-২৫) একই সময়ে এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৮৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে সামগ্রিক RMG রপ্তানি কমেছে ৫২ কোটি ২৩ লাখ ডলার। শতকরা হিসেবে এই পতন ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
নিটওয়্যার ও ওভেন: উভয় খাতেই নিম্নমুখী প্রবণতা
পোশাক খাতের দুটি প্রধান উপখাত—নিট পোশাক (Knitwear) এবং ওভেন পোশাক (Woven)—উভয় ক্ষেত্রেই রপ্তানি কমেছে।
নিটওয়্যার: চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৪৮ কোটি ৮১ লাখ ডলারের। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ২২ শতাংশ কম। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৩ কোটি ৭৪ লাখ ডলার।
ওভেন: ওভেন পোশাকে নিম্নগতির হার সামান্য কম হলেও তা নেতিবাচক। আলোচিত ছয় মাসে এই খাতে রপ্তানি হয়েছে ৮৮৭ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যা আগের বছরের ৯০৫ কোটি ৩ লাখ ডলারের চেয়ে ১ দশমিক ৯১ শতাংশ কম।
ডিসেম্বরে তীব্র ধস: কারণ ও প্রভাব
অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক পতনকে আরও গভীর করেছে সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বর মাসের পারফরম্যান্স। একক মাস হিসেবে ডিসেম্বরে রপ্তানি কমেছে উদ্বেগজনক হারে—১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মোট ৩২৩ কোটি ৪১ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের ডিসেম্বরের ৩৭৭ কোটি ৫ লাখ ডলারের চেয়ে ৫৩ কোটি ৬৪ লাখ ডলার কম। মাসটিতে নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৬৩ কোটি ১৮ লাখ ডলারের এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৬০ কোটি ২৪ লাখ ডলারের। এই পতন বৈশ্বিক Market-এ বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জকে প্রকট করে তুলেছে।
কেন এই পতন? খাতসংশ্লিষ্টদের বিশ্লেষণ
খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তারা এই পতনের জন্য মূলত একাধিক Global ও স্থানীয় কারণকে দায়ী করেছেন:
১. Global Recession ও Inflation: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ Inflation-এর কারণে প্রধান ক্রেতা দেশ, বিশেষত ইউরোপ ও আমেরিকার ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা (Buyers) নতুন Order দেওয়া বা বিদ্যমান Order-এর পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। ২. US Tariffs ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা: মার্কিন শুল্ক (US Tariffs) আরোপের কারণে ভারত এবং চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো ইউরোপের বাজারে জোর দিয়েছে। তারা অপেক্ষাকৃত কম দামে পোশাকের Order গ্রহণ করছে, যার ফলে বাংলাদেশের পোশাক ইউরোপীয় Market-এ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। ৩. স্থানীয় অনিশ্চয়তা: দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব বা সার্বিক অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন করে রপ্তানি আদেশ দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন। এই আস্থাহীনতা সামগ্রিকভাবে রপ্তানি কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
একক বছর বনাম অর্ধ-বার্ষিক চিত্র
উল্লেখ্য, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি কমলেও, একক বছর হিসেবে ২০২৫ সালে পোশাক রপ্তানি সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে মোট ৩ হাজার ৮৮২ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা ২০২৪ সালের ৩ হাজার ৮৪৮ কোটি ২১ লাখ ডলারের চেয়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি। তবে RMG রপ্তানি খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সামান্য প্রবৃদ্ধি এসেছে মূলত বছরের প্রথম দিকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে। অর্থবছরের শেষার্ধে এই নিম্নগতি অব্যাহত থাকলে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব গুরুতর হতে পারে।