সাধারণত বর্ষাকালকে মশাবাহিত রোগের মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, মাঠের বাস্তবতা দিচ্ছে ভিন্ন তথ্য। হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যেও চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন জনপদে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ নেই, যা জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক), জেনারেল হাসপাতাল এবং মা ও শিশু হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃতিতে শীতের তীব্রতা বাড়লেও ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার রোগীর সংখ্যা কমছে না। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের (জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর) চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮৮৭ জন এবং মারা গেছেন ৩১ জন।
যেসব এলাকা হটস্পট সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) এলাকার সাতটি ওয়ার্ড ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার হটস্পট হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই এলাকাগুলো হলো— কোতোয়ালি, বাকলিয়া, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ, চকবাজার, হালিশহর ও পাঁচলাইশ। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, এসব এলাকায় সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এছাড়াও, সীতাকুণ্ড, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা উপজেলাতেও রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চসিক ও এআরএফের যৌথ উদ্যোগে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণ: রোগের কারণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর-এর তথ্যমতে, যে সময়ে ডেঙ্গু সংক্রমণ কমে যাওয়ার কথা, ঠিক সেই সময়েই সংক্রমণ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change), দীর্ঘ সময় উষ্ণ আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং নগর এলাকায় পানি জমে থাকার প্রবণতাকে দায়ী করছেন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে এডিস মশার প্রজননকাল দীর্ঘ হয়েছে, ফলে ডেঙ্গু কার্যত সারা বছরের রোগে পরিণত হয়েছে।
চিকুনগুনিয়া: দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, চিকুনগুনিয়া এখন আর কেবল স্বল্পমেয়াদি জ্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশের ক্ষেত্রে তীব্র অস্থিসন্ধির ব্যথা তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হচ্ছে। এটি কর্মক্ষমতা হ্রাস ও উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মশা নিয়ন্ত্রণে চসিকের উদ্যোগ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৯ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বরাদ্দ থাকলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন কালবেলাকে জানান, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ গ্রহণে চসিক ভবিষ্যতে সীমান্তবিহীন চিকিৎসক দল (MSF)-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে।
গবেষণার নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. আদনান মান্নানসহ একদল গবেষক। অধ্যাপক মান্নান বলেন, ভাইরাসের জিনগত বিশ্লেষণে নতুন মিউটেশন (Mutation) শনাক্ত হয়েছে, যা রোগের বিস্তার ও তীব্রতার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু ডেঙ্গুকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল দিয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়, সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা জরুরি।