বাংলাদেশের রাজনীতির এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আগামী দিনে যে সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে, তাদের জন্য পথ চলা খুব একটা মসৃণ হবে না। বিশেষ করে গত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করা এবং নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণের চাপ সামলানো হবে এক বিশাল ‘বোঝা’। সমকালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিশিষ্ট বিশ্লেষক খাজা মাঈন উদ্দিন এই চ্যালেঞ্জগুলোর একটি গভীর চিত্র তুলে ধরেছেন।
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও নাশকতার ঝুঁকি নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে মিছিল বা অবস্থান ধর্মঘট হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া সাবেক শাসক দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের সুবিধাভোগী দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীগুলো। তারা পুনরায় সংগঠিত হয়ে নাশকতার চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ (৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট) দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি প্রবল।
অর্থনৈতিক সংকট ও অর্থ পাচারের উত্তরাধিকার নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় বোঝা হতে যাচ্ছে ভঙ্গুর অর্থনীতি। বিগত সরকারের আমলে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার এবং ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা পরবর্তী সরকারের কাঁধে বড় দায় হিসেবে চেপে বসবে। বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি হ্রাস এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা না গেলে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে, যা বিরোধী শক্তিগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।
ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ কূটনৈতিক অঙ্গনেও নতুন সরকারকে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। গত ১৫ বছর ধরে বিদেশি শক্তি এবং বিদেশি কূটনীতিকরা শেখ হাসিনার নির্দিষ্ট ঘরানার ‘সেক্যুলার’ রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত ছিলেন। এখন ক্ষমতার কেন্দ্র বাম থেকে ডানে সরে আসা এবং নতুন মেরূকরণকে বিশ্বদরবারে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা এবং পশ্চিমা বিশ্বের প্রত্যাশা পূরণ করা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করা হবে অত্যন্ত দুরূহ।
প্রতিষ্ঠানের সংস্কার বনাম জনআকাঙ্ক্ষা জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার পারদ এখন তুঙ্গে। বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানো এবং সেগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা সরকারের জন্য বড় দায়। যদি এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় দেরি হয় অথবা স্বচ্ছতার অভাব থাকে, তবে ‘গঠিতব্য’ সরকারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
পরিশেষে, নিবন্ধে সতর্ক করা হয়েছে যে, কেবল ক্ষমতা গ্রহণ করলেই হবে না; এই পাহাড়সম বোঝাগুলো দক্ষতার সঙ্গে বয়ে নেওয়ার সক্ষমতা থাকলেই কেবল নতুন সরকার সফল হতে পারবে।