দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক সংকট আর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি হয়েছে ইরান। দেশটিতে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ক্রমে আরও সহিংস রূপ ধারণ করছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির (HRANA) দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ধরপাকড় তীব্রতর করেছে দেশটির প্রশাসন, যেখানে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সহিংসতা ও প্রাণহানির ভয়াবহ চিত্র
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়িতে ধুঁকতে থাকা ইরানের জনজীবনে নেমে আসা ‘ইকোনমিক ক্রাইসিস’ (Economic Crisis) বা অর্থনৈতিক মন্দাই এই বিক্ষোভের মূল উৎস। কিন্তু বর্তমানে এই আন্দোলন কেবল অর্থনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। মানবাধিকার সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত ৩৫ জনের মধ্যে ২৯ জন সাধারণ বিক্ষোভকারী এবং ৪ জন শিশু রয়েছে। এছাড়া সংঘাত চলাকালে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর (Security Forces) ২ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘ফার্স নিউজ’ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের দমনে নিয়োজিত অন্তত ৩শ’ পুলিশ এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। রাজপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হার্ডলাইন (Hardline) অবস্থান এবং টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেটের ব্যবহারের মুখেও পিছু হটছে না সাধারণ মানুষ।
তেহরানের কঠোর অবস্থান ও ভূ-রাজনীতি
বিক্ষোভের এই তীব্রতার পেছনে সরাসরি পশ্চিমা উসকানিকে দায়ী করছে তেহরান। সোমবার এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীদের প্রতি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের প্রকাশ্য সমর্থন ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং ‘ভায়োলেন্স’ (Violence) উসকে দেওয়ার নামান্তর। বাঘাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যেকোনো মূল্যে ইরান তার ‘ন্যাশনাল সোভেরেনিটি’ (National Sovereignty) বা জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিদেশি শক্তির ইন্ধনে পরিচালিত কোনো অপতৎপরতা সহ্য করা হবে না বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
খামেনির ‘প্ল্যান বি’ ও রাশিয়ার সম্ভাব্য আশ্রয়
এদিকে চলমান এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’ এক বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পরিস্থিতির চরম অবনতি সামাল দিতে একটি ‘প্ল্যান বি’ (Plan B) প্রস্তুত রেখেছেন।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়, যদি নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমনে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয় বা সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হতে অস্বীকার করে, তবে খামেনি তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিয়ে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন। এই সম্ভাব্য পলায়নের গন্তব্য হিসেবে রাশিয়ার নাম উঠে এসেছে। তবে তেহরান প্রশাসন এই প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন ও প্রোপাগান্ডা বলে নাকচ করে দিয়েছে।
ডিজিটাল অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
ইরান জুড়ে এই অস্থিরতার মধ্যে ইন্টারনেট পরিষেবার ওপরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। মূলত আন্দোলনকারীরা যাতে ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’ ব্যবহার করে বড় জমায়েত করতে না পারে, সেজন্যই এই পদক্ষেপ। বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিক্ষোভ কেবল একটি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। চলমান এই ‘পলিটিক্যাল ক্রাইসিস’ (Political Crisis) কতদূর গড়ায়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব সম্প্রদায়।