শীতের সকালের মিষ্টি রোদে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার চিরায়ত বাঙালি ঐতিহ্য এখন এক প্রাণঘাতী আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য নতুন উদ্বেগের বিষয় হলো, নিপাহ ভাইরাস এখন আর কেবল শীতকালীন সীমাবদ্ধতায় আটকে নেই। বদলে গেছে এর ‘Seasonal Pattern’ বা ঋতুভিত্তিক সংক্রমণের ধরন। এখন কেবল খেজুরের রস নয়, বাদুড়ের মুখ দেওয়া আম, জাম বা লিচুর মতো ফল খেয়েও মানুষ এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। আইইডিসিআর (IEDCR)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক লোমহর্ষক চিত্র—২০২৫ সালে বাংলাদেশে এই ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল শতভাগ।
ইতিহাসে প্রথম ‘অ-মৌসুমি’ সংক্রমণ
বুধবার (৭ জানুয়ারি) আইইডিসিআর মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস তার গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন করেছে। আগে একে শীতকালীন রোগ মনে করা হলেও, গত বছরের আগস্ট মাসে নওগাঁর এক ৮ বছরের শিশুর মৃত্যু চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। তদন্তে দেখা গেছে, শিশুটি কোনো খেজুরের রস পান করেনি, বরং সে বাদুড়ের আধা-খোয়া ‘কালোজাম’ ও ‘আম’ খেয়েছিল। এটিই দেশের ইতিহাসে প্রথম ‘Off-season’ বা অ-মৌসুমি নিপাহ সংক্রমণ হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ, বছরের যেকোনো সময় বাদুড়ের লালা বা মূত্র মিশ্রিত ফল খেলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ‘High Risk’ তৈরি হয়েছে।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান: মৃত্যুহার যখন ১০০ শতাংশ
বিশ্বজুড়ে নিপাহ ভাইরাসে গড় মৃত্যুহার যেখানে ৭২ শতাংশ, বাংলাদেশে সেখানে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইইডিসিআরের ‘Data Analysis’ অনুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫—টানা দুই বছর বাংলাদেশে শনাক্ত হওয়া সব রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারীতে চারজন রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন এবং তাদের সবাই প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে দেশের ৩৫টি জেলায় এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও নওগাঁকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ: একটি সাইলেন্ট কিলিং থ্রেট
গবেষণায় আরও একটি ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। নিপাহ কেবল ফল বা রস থেকেই ছড়ায় না; প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি ‘Human-to-Human Transmission’ বা মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা পরিবারের সদস্য বা সেবা দানকারী স্বাস্থ্যকর্মীরাও এই ভাইরাসের শিকার হচ্ছেন। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বিষয়টিকে একটি ‘বিরাট সতর্কবার্তা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “নিপাহ এখন বহুমুখী সংক্রমণের হুমকিতে পরিণত হয়েছে, যা মোকাবিলায় সাধারণ সচেতনতাই আমাদের একমাত্র হাতিয়ার।”
প্রতিরোধ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
নিপাহ ভাইরাসের এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন বা সুনির্দিষ্ট ‘Medical Treatment’ উদ্ভাবিত হয়নি। তাই সংক্রমণ রোধে বিশেষজ্ঞরা কঠোর কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন:
কাঁচা রস বর্জন: শীতকালীন খেজুরের কাঁচা রস পান করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতে হবে।
আধা-খোয়া ফল: গাছ থেকে পড়ে থাকা বা কোনো প্রাণীর কামড়ানো বা আধা-খোয়া ফল ভুলেও খাওয়া যাবে না।
সঠিক পরিচ্ছন্নতা: যেকোনো ফল বাজার থেকে আনার পর বা খাওয়ার আগে পরিষ্কার ও নিরাপদ পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
সুরক্ষা সরঞ্জাম: আক্রান্ত ব্যক্তির সেবা করার সময় অবশ্যই মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে এবং সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে।
সরকারের জরুরি প্রস্তুতি
নিপাহর এই পরিবর্তিত আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশের ‘Public Health’ বিভাগকে সতর্ক করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোকে যেকোনো ‘Outbreak’ মোকাবিলায় জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আধুনিক ‘Diagnostic’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত সংক্রমণ শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যাতে প্রাণহানি কমানো যায়।
সারসংক্ষেপ:
নিপাহ ভাইরাস এখন আর ঋতুভিত্তিক কোনো সাধারণ সংক্রমণ নয়, বরং এটি সারা বছরের জন্য এক মরণফাঁদ। বাদুড়ের লালা মিশ্রিত যেকোনো ফল এই ভাইরাসের বাহক হতে পারে। যেহেতু এর কোনো টিকা নেই, তাই সচেতনতাই হতে পারে আপনার ও আপনার পরিবারের জীবন রক্ষার একমাত্র গ্যারান্টি।