• দেশজুড়ে
  • রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: বিশ্বশক্তির কৌশলগত চাল ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: বিশ্বশক্তির কৌশলগত চাল ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: বিশ্বশক্তির কৌশলগত চাল ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

আরাকান আর্মির উত্থান, জান্তার পতন এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির দোলাচলে প্রত্যাবাসনের আশ্বাস এখন সুদূরপরাহত

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলো আজ বৈশ্বিক মানবিক সংকটের এক নীরব সাক্ষী। সম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একত্রে ইফতার আয়োজনে উপস্থিত থাকা বিশ্বের নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠীর প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা ছিল। তবে ইউক্রেন ও গাজার মতো রক্তক্ষয়ী সংঘাতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ নিবদ্ধ থাকায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি আজ অনেকটা ‘বিস্মৃত ট্র্যাজেডি’ হিসেবে অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এটি এক বিশাল ‘টাইমবোম’।

রোহিঙ্গাদের সুপ্রাচীন ইতিহাস ও আইনি অধিকার

রোহিঙ্গারা কি কেবলই উদ্বাস্তু গোষ্ঠী? ইতিহাস বলছে, তাদের আত্মপরিচয় সুগভীর। অষ্টম শতাব্দী থেকে আরাকানের উপকূলে গড়ে ওঠা বসতি থেকেই এই জাতিসত্তার বিকাশ। তারা মিয়ানমারের মাটিতে কোনো ‘বহিরাগত’ নয়, বরং ওই ভূমিরই ভূমিপুত্র। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, যেখানে বৌদ্ধ রাজা এবং মুসলিমদের এক অনন্য সাংস্কৃতিক মিলনমেলা ছিল। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর মিয়ানমারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী উ নু আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী’ (Indigenous Ethnic Group) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এই দীর্ঘ ইতিহাসই প্রমাণ করে, তাদের অধিকার কেবল মানবিক নয়, আইনি ও ঐতিহাসিক।

জান্তার আত্মঘাতী ভুল এবং আরাকান আর্মির উত্থান

রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু হয় ১৭৮৪ সালে বর্মী রাজা বোডাওপায়ার আরাকান দখলের পর। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’ ছিল জাতিগত নিধনের এক ভয়ংকর অধ্যায়। আশ্চর্যজনকভাবে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা তাদের এই অনুগত জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করে নিজেই ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাসের শিকার হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার ফলে রাখাইন রাজ্যে যে ‘পাওয়ার ভ্যাকুয়াম’ তৈরি হয়, তাকে কাজে লাগিয়েছে আরাকান আর্মি (AA)। তারা এখন রাখাইনের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা দখল করে নিয়েছে। জান্তা এখন নিজের খোঁড়া গর্তে নিজেই পড়েছে।

প্রত্যাবাসন কৌশলে বাংলাদেশের ব্যর্থতা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০১৭ সালের চরম সংকটের মুহূর্তে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে আন্তর্জাতিক ‘ব্র্যান্ডিং’ (যেমন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’) এবং নিজের ‘ইমেজ’ গড়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। সীমান্ত খুলে দেওয়া মানবিকতার দাবি হলেও, এর পরপরই যে কঠোর ‘ডিফেন্সিভ ডিপ্লোম্যাসি’ বা শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানের প্রয়োজন ছিল, তা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যার খেসারত হিসেবে আজ কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত অঞ্চলে অস্থিরতা ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন তৈরি হয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে বৃহৎ শক্তিসমূহের ভূমিকা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখন আর কেবল ঢাকা-নেপিডো দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নয়, এটি একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক দাবার বোর্ড।

  • চীন: রাখাইন ও মিয়ানমার জান্তার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিভাবক। কিয়াকপু গভীর সমুদ্রবন্দর ও গ্যাস-তেল পাইপলাইনের নিরাপত্তা চীনের মূল অগ্রাধিকার। চীন একদিকে মধ্যস্থতার নাটক করে, অন্যদিকে জাতিসংঘে জান্তার পক্ষে ‘ভেটো’ দিয়ে তাদের রক্ষা করে।
  • ভারত: ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পলিসির অংশ হিসেবে ‘কালাদান মাল্টি-মোডাল প্রজেক্ট’ নিয়ে সক্রিয়। কৌশলগত বিনিয়োগ রক্ষার জন্য তারা জান্তা ও আরাকান আর্মি— উভয়কেই চটাতে চায় না, যা জান্তাকে এক ধরনের দায়মুক্তির সুযোগ করে দিচ্ছে।
  • যুক্তরাষ্ট্র: ‘বার্মা অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কথা বললেও, তাদের মূল লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের আধিপত্য কমানো। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা তাদের কাছে জান্তাকে চাপে ফেলার একটি কার্যকর অস্ত্র মাত্র।

টেকসই সমাধানের পথ: অপ্রচলিত কূটনীতি

প্রধান উপদেষ্টার আগামী ঈদের আগেই প্রত্যাবাসনের আশ্বাস মাঠের কঠোর বাস্তবতার মুখে পড়েছে। কারণ, মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন বহাল থাকা এবং রাখাইন এখন সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র হওয়া— উভয়ই প্রত্যাবাসনের পথে বাধা। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট (ইউক্রেন-গাজা) এখন প্রতিকূল।

এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন ‘অপ্রচলিত কূটনীতি’ (Unconventional Diplomacy)। যেহেতু মিয়ানমার জান্তা এখন আর রাখাইনের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রক নয়, তাই প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশকে এখন ছায়া সরকার এবং সরাসরি আরাকান আর্মির (AA) সাথে ‘ট্র্যাক-টু ডিপ্লোম্যাসি’র মাধ্যমে দরকষাকষির টেবিলে বসতে হবে। একইসাথে, রাখাইনের ভেতরে জাতিসংঘ বা কোনো তৃতীয় শক্তির অধীনে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ (Safe Zone) তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো জরুরি।

পরিশেষে, এই সংকটকে কেবল মানবিক বোঝা হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি টেকসই, মর্যাদাপূর্ণ ও নাগরিকত্বসহ প্রত্যাবাসনই পারে এই দীর্ঘ ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়ের ইতি টানতে।

Tags: bnp bangladesh politics election nomination sirajganj-3 khandakar selim jahangir