খুলনার কয়রা উপজেলার বাগালি ইউনিয়নের ঘুঘরাকাঠি গ্রাম। একসময় যে জনপদ ছিল সুজলা-সুফলা, আজ সেখানে প্রকৃতি আর মানুষের দীর্ঘশ্বাস। দখল আর অপরিকল্পিত ভরাটে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে এই গ্রামের প্রাণস্পন্দন হিসেবে পরিচিত ২০ একরের সুবিশাল খালগুলো। কৃষি, মৎস্য সম্পদ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রধান অবলম্বন এই জলাশয়গুলো এখন প্রভাবশালী মহলের দখলে। ফলে রুদ্ধ হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ (Natural Flow), যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্থানীয় Ecology এবং কয়েক হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা।
কৃষি ও মৎস্য সম্পদে ধস: বিপন্ন জনপদ
ঘুঘরাকাঠি গ্রামে প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসবাস। একসময় এই গ্রামের ভেতর ও চারপাশ দিয়ে বয়ে চলা একাধিক খাল ছিল কৃষি সেচ (Irrigation) ও বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের (Drainage system) প্রধান মাধ্যম। স্থানীয়রা জানান, এই খালগুলো থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত বহু মৎস্যজীবী পরিবার। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ খাল ভরাট করে বসতঘর ও স্থায়ী স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, খালের বুক চিরে কোথাও উঠেছে প্রাচীর, কোথাও আবার মাটি ফেলে পানি চলাচলের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
জলাবদ্ধতা ও অর্থনৈতিক মন্দার কবলে গ্রামবাসী
খালগুলো ভরাট হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হচ্ছে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা (Waterlogging)। বৃষ্টির পানি বের হওয়ার পথ না থাকায় প্লাবিত হচ্ছে মাছের ঘের ও ফসলি জমি। এতে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষকরা। গ্রামের বাসিন্দা সাঈদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "গত এক দশকে পরিকল্পিতভাবে একটির পর একটি খাল গ্রাস করা হয়েছে। খালের অস্তিত্ব যেখানে আছে, সেখান থেকেও আমাদের পানি নিতে দেওয়া হয় না। উপকূলীয় এই প্রান্তিক মানুষগুলোর বেঁচে থাকার রসদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে।" খালের অভাব আর চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ায় এলাকায় বেকারত্ব ও দারিদ্র্য চরম আকার ধারণ করেছে।
মালিকানা বনাম দখলদারিত্বের সংঘাত
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগের তির আজিজুর রহমান সানা ও তার ভাইদের দিকে। দীর্ঘ সময় ধরে তারা এই সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন বলে দাবি গ্রামবাসীদের। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত আজিজুর রহমান সানা। তার দাবি, "এই জমিগুলো আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি এবং আমরা নিয়মিত সরকারকে খাজনা দিয়ে আসছি। এখানে কোনো বেআইনি দখল বা সরকারি খাল ভরাটের ঘটনা ঘটেনি।"
এদিকে, গ্রামবাসী বলছেন, প্রভাবশালীদের দাপটে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর আজ রুদ্ধ। বারবার অভিযোগ করেও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান সমাধান মেলেনি।
প্রশাসনের কড়া হুঁশিয়ারি ও উদ্ধারের আশ্বাস
দেশের প্রচলিত ভূমি আইন অনুযায়ী, সর্বসাধারণের ব্যবহারের কোনো খাল বা প্রাকৃতিক জলাশয় কোনোভাবেই ব্যক্তি মালিকানাধীন হতে পারে না। এই আইনি কাঠামোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে খুলনার জেলা প্রশাসক আ. স. ম. জামশেদ খোন্দকার কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, "জনস্বার্থ বিঘ্নিত করে খাল দখলের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত সময়ের মধ্যে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে এবং খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
টেকসই সমাধানের প্রত্যাশা
পরিবেশবিদদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে খাল রক্ষা করা কেবল কৃষির জন্য নয়, বরং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্যও অপরিহার্য। দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান (Eviction Drive) চালিয়ে খালগুলো দখলমুক্ত না করলে ঘুঘরাকাঠি গ্রামটি অচিরেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এখন দেখার বিষয়, স্থানীয় প্রশাসনের আশ্বাস বাস্তবায়নে কতটুকু গতি পায় এবং সাধারণ মানুষ তাদের অধিকার ফিরে পায় কি না।