বর্তমান বিশ্বে মারণব্যাধি ক্যানসারের যতগুলো ধরন রয়েছে, তার মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসার বা ‘Lung Cancer’ আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুর হার সর্বাধিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বায়ুদূষণ, পরোক্ষ ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার কারণে এই রোগটি এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রোগটি যখন ধরা পড়ে, তখন তা ‘Advanced Stage’-এ পৌঁছে যায়। এর প্রধান কারণ হলো প্রাথমিক উপসর্গগুলোকে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া। চিকিৎসকদের মতে, শরীরের পাঠানো ছোট ছোট সঙ্কেতগুলো চিনতে পারলেই সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব এবং জীবন বাঁচানো সহজ হয়।
ফুসফুসে ক্যানসার বাসা বাঁধলে শরীর যে ৫টি বিশেষ সঙ্কেত বা ‘Warning Signs’ দেয়, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
বিরামহীন কাশি: সাধারণ সর্দি নাকি ক্যানসারের সঙ্কেত? ঋতু পরিবর্তনের সময় বা সাধারণ সর্দি-জ্বরে কাশি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই কাশি যদি দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবে তা চিন্তার কারণ হতে পারে। ফুসফুসে ক্যানসারের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ হলো ‘Chronic Cough’ বা দীর্ঘস্থায়ী কাশি। বিশেষ করে কাশির সঙ্গে কফ বা রক্ত দেখা দিলে কোনোভাবেই সময় নষ্ট করা উচিত নয়। এটি ফুসফুসের ভেতরে কোনো টিউমারের অস্বস্তির ফল হতে পারে।
শ্বাসকষ্ট বা Shortness of Breath: কেন অবহেলা করবেন না?
অনেকেরই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলে বা সামান্য পরিশ্রম করলে শ্বাসকষ্ট হয়, যা আমরা সাধারণত হাঁপানি বা বয়সের দোষ বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া কিংবা দম ফুরিয়ে আসার অনুভূতি ফুসফুস ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। টিউমার যদি শ্বাসনালীতে বাধা সৃষ্টি করে বা ফুসফুসের চারপাশে তরল জমতে শুরু করে, তবেই এমন সমস্যা দেখা দেয়।
গলার স্বরে অতর্কিত পরিবর্তন
সর্দি বা গলাব্যথা ছাড়াই যদি আপনার গলার স্বর হঠাৎ কর্কশ হয়ে যায় বা ভেঙে যায় (Hoarseness), তবে সতর্ক হোন। ফুসফুসের টিউমার যদি কণ্ঠনালীর সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তবে গলার স্বর বদলে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে গলা ভাঙা থাকা ক্যানসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘Red Flag’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বুক, পিঠ ও কাঁধের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা
ফুসফুস ক্যানসার মানেই শুধু বুকে ব্যথা হবে, তা নয়। অনেক সময় এই ক্যানসারের ব্যথা পিঠ, মেরুদণ্ড কিংবা কাঁধেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে গভীর শ্বাস নেওয়ার সময়, হাসলে বা কাশির সময় যদি বুকে তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভূত হয়, তবে তা ফুসফুসের আবরণের সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘Chest Wall Pain’ বলা হয়।
অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দীর্ঘমেয়াদী অবসাদ
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরেও কি আপনি সারাক্ষণ ক্লান্ত বোধ করেন? ক্যানসার কোষ যখন শরীরে বাড়তে থাকে, তখন তারা শরীরের শক্তি ক্ষয় করতে শুরু করে। ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ফলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রাও হ্রাস পায়, যা শরীরকে অবসন্ন করে তোলে। এই ধরণের ‘Fatigue’ বা ক্লান্তি সাধারণ শারীরিক দুর্বলতার চেয়ে আলাদা এবং দীর্ঘস্থায়ী।
প্রতিরোধ ও সচেতনতা
ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ধূমপান ত্যাগ করা সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি বায়ুদূষণ থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার এবং নিয়মিত ‘Health Checkup’ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে, তাদের জন্য ‘Early Diagnosis’ বা দ্রুত রোগ নির্ণয় জীবনদায়ী হতে পারে। মনে রাখবেন, সচেতনতাই এই মারণব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।