জনগণের দোরগোড়ায় সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হয়েছিল বিশাল এক Project। ব্যয় করা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় কোষাগারের প্রায় ৫ কোটি টাকা। কিন্তু দীর্ঘ ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও চুয়াডাঙ্গার জীবননগর পৌরবাসীর ভাগ্যে জোটেনি এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানি। উল্টো কোটি কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি এখন অযত্ন আর অবহেলায় জং ধরে নষ্ট হচ্ছে। যে শোধনাগারটি হওয়ার কথা ছিল জীবনের আধার, সেটি এখন আগাছা আর ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে এক ভুতুড়ে রূপ ধারণ করেছে।
পরিত্যক্ত ভাগাড় ও নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান Infrastructure সরেজমিনে জীবননগর পৌর পানি শোধনাগার ও পাম্প হাউজ এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ ২০২১ সালে শেষ হলেও একদিনের জন্যও এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। পাম্প হাউজ ও শোধনাগারের চারপাশ এখন লতা-পাতা আর আগাছায় ঢাকা। শোধনাগারের ট্যাংকগুলোতে জমে আছে শেওলা ধরা পচা পানি। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় কয়েক কোটি টাকার পাম্প এবং যান্ত্রিক সরঞ্জামগুলো এখন প্রায় অকেজো হওয়ার পথে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হস্তান্তরের পর থেকেই এই স্থাপনাটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
অদূরদর্শী পরিকল্পনা ও মুখ থুবড়ে পড়া প্রজেক্ট
সূত্রমতে, চুয়াডাঙ্গা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর (DPHE) ‘৪৫ পৌরসভা থানা গ্রোথ সেন্টার’ প্রকল্পের আওতায় এই পানি শোধনাগারটি নির্মাণ করে। মূল শোধনাগার ও পাম্প হাউজ ছাড়াও নারায়ণপুর সরকারপাড়া ও জীবননগর হাই স্কুলপাড়ায় দুটি অতিরিক্ত পাম্প হাউজ স্থাপন করা হয়। ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ এবং ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সংযোগ লাইন স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করে গোপালগঞ্জের ‘মনির ট্রেডার্স’ নামক একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু প্রকল্পের শুরুতেই ছিল পরিকল্পনার অভাব। সংযোগ লাইনের বিস্তৃতি ও লোকবল নিয়োগের মতো মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষা করায় বর্তমানে ৫০০ গ্রাহক সংযোগ নিয়েও কোনো সেবা পাচ্ছেন না।
বিশুদ্ধ পানির বদলে মিলছে রোগ-ব্যাধ
পৌর এলাকার অন্তত ৫ হাজার মানুষ বর্তমানে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। দীর্ঘ ৫ বছরেও প্রকল্পের সুবিধা না মেলায় বাধ্য হয়েই সাধারণ মানুষকে আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত পানি পান করতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা তুহিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা নিয়মিত আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছি। অথচ চোখের সামনে কোটি কোটি টাকার শোধনাগার নষ্ট হচ্ছে। পৌরসভা সংযোগ দেওয়ার নাম করে আমাদের কাছ থেকে টাকা নিলেও পানি সরবরাহের কোনো উদ্যোগ নেই।” আরেক বাসিন্দা মিন্টু মিয়ার মতে, এই প্রকল্প এখন পৌরবাসীর কাছে ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাদকের অভয়ারণ্য ও আবাসন সংকট
শোধনাগারের দোতলা ভবনটি এখন আর জনসেবার কাজে লাগছে না। অভিযোগ উঠেছে, সেখানে এখন মাদকাসক্তদের নিরাপদ আশ্রয় গড়ে উঠেছে। দিন-রাত চলছে নিয়মিত মাদক সেবন। অন্যদিকে, প্রশাসনিক উদাসীনতায় ভবনের একাংশে সুইপারদের ৮টি পরিবারকে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। যে স্থাপনাটি হওয়ার কথা ছিল একটি অত্যাধুনিক সার্ভিস সেন্টার, সেটি এখন আবাসন আর নেশার আড্ডায় পর্যবসিত হয়েছে।
দায় এড়ানোর চিরাচরিত সংস্কৃতি
প্রকল্পের এই শোচনীয় অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে জীবননগর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আবুল কাশেম জানান, নানা ধরনের কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শোধনাগারটি চালু করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, “বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং জনবল না পেলে এটি চালু করা অসম্ভব। সুইপারদের আবাসন সমস্যা থাকায় সাময়িকভাবে তাদের এখানে থাকতে দেওয়া হয়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সঠিক Maintenance পরিকল্পনা ও অদূরদর্শিতার অভাবেই এই বিশাল বিনিয়োগ আজ অর্থহীন হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা না নিলে এই ৫ কোটি টাকার পুরো বিনিয়োগই শেষ পর্যন্ত গচ্চা যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।