বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে দীর্ঘ খরা কাটিয়ে অবশেষে মিলল সৌভাগ্যের দেখা। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সেন্টমার্টিন চ্যানেলে এক জেলের জালে ধরা পড়েছে রেকর্ডসংখ্যক ৬৮৭টি লাল কোরাল মাছ। বিরল এই বড় চালানের বাজারমূল্য (Market Value) উঠেছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। বুধবার (৭ জানুয়ারি) বিকেলে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ মিস্ত্রিপাড়া ফিশারিজ ঘাটে মাছগুলো আনা হলে পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
সেন্টমার্টিন চ্যানেলে সৌভাগ্যের ছোঁয়া
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা মোহাম্মদ জাকারিয়ার মালিকানাধীন একটি ফিশিং ট্রলার মঙ্গলবার সমুদ্রের উদ্দেশে রওনা দেয়। ট্রলারের প্রধান মাঝি আবুল কালামের নেতৃত্বে নয়জন মাঝিমাল্লা নিয়ে সেন্টমার্টিন চ্যানেলের ‘মৌলভীর শীল’ নামক পয়েন্টে অবস্থান নেন তারা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সাগরে জাল ফেলার পর থেকেই বড় কিছু পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন জেলেরা। বুধবার ভোরে জাল তোলার সময় তারা দেখতে পান লালচে আভায় ছেয়ে গেছে পুরো জাল। একে একে ৬৮৭টি সুদৃশ্য লাল কোরাল ট্রলারে তোলা হয়।
১০ লাখ টাকায় বিক্রি: খুশির জোয়ার শাহপরীর দ্বীপে
মাছগুলো ঘাটে আনা হলে দীর্ঘ বিরতির পর এত বড় শিকার দেখতে ভিড় জমান স্থানীয় মৎস্যজীবী ও পর্যটকরা। ট্রলার মালিক মোহাম্মদ জাকারিয়া জানান, ধরা পড়া মাছগুলোর মধ্যে ১০টি নিজেদের খাওয়ার জন্য রেখে বাকি ৬৭৭টি মাছ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রাথমিক অবস্থায় মণপ্রতি ২৪ হাজার টাকা দাম হাঁকা হলেও শেষ পর্যন্ত দর কষাকষির মাধ্যমে মণপ্রতি ২৩ হাজার টাকা দরে ১০ লাখ টাকায় মাছগুলো বিক্রি করা হয়। স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী রহিম উল্লাহ এই পুরো লটটি কিনে নিয়েছেন। তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ‘Fresh Catch’ বরফজাত করে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বড় আড়তগুলোতে পাঠানো হবে।
কেন এত মূল্যবান এই লাল কোরাল?
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরাল বা ভেটকি জাতীয় এই মাছটি অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন হওয়ায় দেশজুড়ে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে সাগরের একদম গভীর জল (Deep Sea) থেকে এই মাছের বড় ঝাক সচরাচর উপকূলের কাছে আসে না। টেকনাফ উপজেলার জ্যেষ্ঠ সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা উমূল ফারা বেগম তাজকিরা বলেন, "লাল কোরাল সাধারণত উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের গভীর সমুদ্রের মাছ। এটি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। প্রজনন মৌসুমে সরকারের বিভিন্ন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা (Fishing Ban) কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় এখন সাগরে বড় আকৃতির কোরাল পাওয়ার হার বাড়ছে।"
তিনি আরও জানান, ১ থেকে ৯ কেজি ওজনের এই মাছগুলোর চাহিদা যেমন স্থানীয় বাজারে রয়েছে, তেমনি চট্টগ্রামের অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলোতেও এর সরবরাহ চেইন (Supply Chain) বেশ সক্রিয়।
সাফল্যের নতুন সম্ভাবনা দেখছেন জেলেরা
শাহপরীর দ্বীপ মিস্ত্রিপাড়া ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাসান বলেন, "বেশ কিছুদিন ধরে সাগরে মাছের আকাল চলায় জেলেরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এক জালে ১০ লাখ টাকার মাছ পাওয়ার খবরটি অন্য জেলেদের মধ্যেও নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। অন্যান্য ট্রলারগুলোও এখন সেন্টমার্টিন চ্যানেল কেন্দ্রিক তাদের অপারেশন (Operation) পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।"
সাগরের এই রূপালি সম্পদ কেবল জেলের ভাগ্য বদলায়নি, বরং এটি দেশের নীল অর্থনীতির (Blue Economy) অপার সম্ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।