আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সাংবিধানিক এই মহাযজ্ঞকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। রাজনৈতিক দলগুলো প্রথাগত প্রচারণার পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। তবে উৎসবমুখর এই আবহের সমান্তরালে জনমনে উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এবারের নির্বাচনে এআই-চালিত অপতথ্য বা ডিসইনফরমেশন ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীন ক্ষমতাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
ভোটের মাঠে এআই: নতুন ‘গেম প্লেয়ার’?
প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, তার অপব্যবহারের ঝুঁকিও ততটাই বাড়ছে। আসন্ন নির্বাচনে এআই-এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (UIU) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি মনে করেন, এবারের নির্বাচনে এআই একটি শক্তিশালী ‘গেম প্লেয়ার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
অধ্যাপক মামুনের মতে, "প্রতিপক্ষ প্রার্থী বা প্রভাবশালী নেতাদের কণ্ঠস্বর ক্লোন করে ভুয়া অডিও বা তাদের ছবি ব্যবহার করে ‘ডিপফেক’ (Deepfake) ভিডিও তৈরি করা হতে পারে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি এসব কন্টেন্ট সামাজিকভাবে কাউকে হেয় করা বা জনমতকে ভুল পথে চালিত করার হাতিয়ার হতে পারে। এখন কোনটি বাস্তব আর কোনটি প্রযুক্তি দিয়ে বানানো ভুয়া চিত্র, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে।" এই সংকট মোকাবিলায় তিনি প্রতিটি তথ্যের উৎস যাচাই বা ‘ফ্যাক্ট চেক’ করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে বিভ্রান্তির ছায়া
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই আগ্রাসন কেবল ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি আঘাত হানতে পারে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, এআই-এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ভোটারদের বিচারবুদ্ধিকে সংকীর্ণ করে দেবে।
তিনি বলেন, "যখন কৃত্রিমভাবে তৈরি ভুয়া ছবি বা ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষের নিরপেক্ষভাবে বিচার করার ক্ষমতা লোপ পায়। সত্য-মিথ্যার ধোঁয়াশায় পড়ে তারা বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় অন্তরায়।" এছাড়াও অধ্যাপক আহমেদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়ানো এসব অপতথ্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অসহিষ্ণুতা তৈরি করতে পারে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে রাজপথে সহিংসতা বা দাঙ্গা।
প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল সুরক্ষা ব্যূহ
এআই-এর মাধ্যমে ছড়ানো অপপ্রচার ঠেকাতে ইতিমধ্যেই তৎপরতা শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (EC)। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কড়া নজরদারি রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কমিশন সরাসরি কাজ করছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপি (UNDP)-র সঙ্গে।
জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে, যাদের মূল কাজ হবে নির্বাচনের আগে ও পরে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এআই-জেনারেটেড অপতথ্য শনাক্ত করা এবং দ্রুততার সঙ্গে সেগুলো অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া। সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ এবং ডেটা অ্যানালিস্টদের সমন্বয়ে গঠিত এই সেলটি নির্বাচনকালীন সময়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করবে।
সচেতনতাই হোক প্রধান হাতিয়ার
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করার উপায় নেই, তবে এর অপব্যবহার রুখতে সচেতনতার বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি ভোটারদেরও ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তির সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কোনো চমকপ্রদ বা উসকানিমূলক ভিডিও দেখলেই তা বিশ্বাস না করে মূলধারার গণমাধ্যমের খবরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত স্বচ্ছতা এবং সত্যের জয় হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।