ইরানে চলমান সরকারবিরোধী তীব্র গণবিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢাললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান সরকার ‘মহা বিপদে’ রয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি ফের দেশটিতে সরাসরি সামরিক অভিযানের (Military Operation) হুমকি দিয়েছেন। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প জানান, পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তিনি যেকোনো সময় ইরানে হামলার নির্দেশ দিতে পারেন।
ট্রাম্পের ‘কঠোর’ হুঁশিয়ারি ও রণকৌশল
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পরিস্থিতি এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “ইরান সরকার বড় ধরনের সংকটে রয়েছে। বিক্ষোভকারীরা অনেক শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে আমার কাছে খবর আছে, যা কয়েক সপ্তাহ আগেও কেউ কল্পনা করতে পারেনি।”
বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি ইতোমধ্যেই একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠিয়েছি। যদি তারা আগের মতো সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড শুরু করে, তবে আমরা বসে থাকব না। এর অর্থ এই নয় যে মার্কিন পদাতিক বাহিনী ইরানে প্রবেশ করবে; বরং আমরা এমন কিছু স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে (Strategic Points) অত্যন্ত কঠোর হামলা (Hard Strike) চালাব, যেখানে আঘাত করলে তাদের শাসনব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
অর্থনৈতিক ধস ও বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মাধ্যমে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের রেকর্ড দরপতন এবং লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই ইকোনমিক ক্রাইসিস (Economic Crisis) বা অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত কারাজ, ইসফাহান, শিরাজ ও কেরমানশাহসহ বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় তা ব্যাপক রূপ নেয়। বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার প্রতি পরিবারকে মাসিক ৭ ডলার করে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা জনগণের ক্ষোভ প্রশমনে ব্যর্থ হয়েছে।
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA)-এর তথ্যমতে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ জনে। এর মধ্যে ৪৮ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। এছাড়া ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, প্রায় ৩০০ পুলিশ ও আইআরজিসি (IRGC) সদস্য আহত হয়েছেন।
ইরানের এই অস্থিরতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স। এক যৌথ বিবৃতিতে ইউরোপীয় নেতারা বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিভাগও ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
পিছু হটতে নারাজ তেহরান
মার্কিন হুমকি ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখেও অনড় অবস্থানে রয়েছে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এই বিক্ষোভকে ‘বিদেশি শক্তির উসকানি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, বিদেশি শত্রুরা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চাইছে। ইরানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল বিক্ষোভকারীদের ‘সশস্ত্র নাশকতার’ দায়ে অভিযুক্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গোয়েন্দা শাখা জানিয়েছে, শত্রুর পরিকল্পনা নসাৎ না হওয়া পর্যন্ত তাদের অভিযান চলবে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য হুমকি এবং ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিপর্যয়, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সামরিক চাপের মুখে ইরান এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কোণঠাসা। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংঘাত বা বড় আকারের দমন অভিযানের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।