ইরানে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলমান গণবিক্ষোভ এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী পরিণতির দিকে মোড় নিয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স (Reuters) ইরানের একজন সরকারি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ মানুষসহ নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। দেশব্যাপী অস্থিরতা দমনে কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থানের পর এই প্রথম এত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির তথ্য সামনে এল, যা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বিক্ষোভের সূত্রপাত: অর্থনৈতিক ধস ও মুদ্রাস্ফীতি
গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানের রাজধানী তেহরানে ব্যবসায়ীদের আন্দোলনের মাধ্যমে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। ডলারের বিপরীতে ইরানের জাতীয় মুদ্রা ‘রিয়াল’-এর রেকর্ড দরপতন (Currency Devaluation) এবং এর ফলে সৃষ্ট লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুতই রাজনৈতিক রূপ নেয়। তেহরান ছাড়িয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে কারাজ, ইসফাহান, শিরাজ ও কেরমানশাহসহ ১৮৭টি শহরে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে শামিল হওয়ায় তা আরও বেগবান হয়।
কর্তৃপক্ষের দাবি ও বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
ইরানি কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতার জন্য শুরু থেকেই পশ্চিমা শক্তিকে দায়ী করে আসছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে এই অস্থিরতা উস্কে দিচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) একজন ইরানি কর্মকর্তা ২ হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন, এই রক্তপাতের পেছনে ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন বিক্ষোভকারী আর কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান (Data) তিনি দেননি।
মানবাধিকার সংস্থার ভিন্ন তথ্য
নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে বড় ধরনের তারতম্য দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’ (HRANA) জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা অন্তত ৬৪৬ জন। সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৫০৫ জন সাধারণ বিক্ষোভকারী এবং ৯ জন শিশু রয়েছে। এইচআরএএনএ আরও জানিয়েছে, ইরানের ৩১টি প্রদেশের ৬০৬টি স্থানে বিক্ষোভ রেকর্ড করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার ৭২১ জনকে আটক করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।
জাতিসংঘের উদ্বেগ ও শান্তির আহ্বান
ইরানের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ (United Nations)। মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্কের পক্ষ থেকে মুখপাত্র জেরেমি লরেন্স এক বিবৃতিতে বলেন, “ভয়ঙ্কর সহিংসতার এই চক্র আর চলতে পারে না। জনগণের ন্যায্য দাবি ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানানো উচিত।” জাতিসংঘ তাদের নিজস্ব সূত্রের বরাতে নিহতের সংখ্যা ‘শত শত’ বলে উল্লেখ করলেও সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেনি।
গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট ও ভূ-রাজনীতি
ইরানের এই অভ্যন্তরীণ সংকট মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপের হুমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে ইরান সরকার বিক্ষোভ দমনে কঠোর দমনপীড়ন অব্যাহত রেখেছে। দীর্ঘ দুই সপ্তাহের এই অচলাবস্থা কেবল ইরানের অর্থনীতিকেই পঙ্গু করছে না, বরং দেশটির মানবাধিকার (Human Rights) পরিস্থিতিকে বিশ্ব দরবারে এক বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।