রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর বর্বরোচিত গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) দায়ের করা মামলাকে সরাসরি ‘ভিত্তিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ’ বলে দাবি করেছে মিয়ানমার। নেদারল্যান্ডসের হেগ-এ অবস্থিত বিশ্ব আদালতে গাম্বিয়ার আনা এই ঐতিহাসিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) এক কড়া বিবৃতি জারি করেছে দেশটির জান্তা সরকার নিয়ন্ত্রিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মিয়ানমারের দাবি, এই আইনি প্রক্রিয়াটি বাস্তবসম্মত তথ্যের পরিবর্তে কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।
ভিত্তিহীন অভিযোগ ও ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ প্রতিবেদনের দাবি
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাম্বিয়ার করা প্রতিটি অভিযোগ আইন ও বাস্তবতার নিরিখে অসার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, "অবিশ্বস্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন কখনো ধ্রুব সত্যকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।" ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী জান্তা সরকার দাবি করছে, তারা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি 'সৎ বিশ্বাস' বা Good Faith বজায় রেখে আইসিজে-তে সহযোগিতা করছে। মূলত বৈশ্বিক চাপ এবং Legal Proceeding-এর অংশ হিসেবেই তারা এই শুনানিতে অংশগ্রহণ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
রোহিঙ্গা সংকট: একটি মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপট
২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই Genocide বা গণহত্যা মামলাটি দায়ের করে। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ অভিযানের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে ১.১৭ মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সামরিক অভিযানে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা আইসিজে-র কাছে বিভিন্ন সময়ে গণধর্ষণ, পাইকারি হত্যা এবং বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের যে লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন, তাকেই মামলার প্রধান ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে গাম্বিয়া।
আদালতে গাম্বিয়ার কড়া অবস্থান
সোমবার (১২ জানুয়ারি) শুনানির প্রথম দিনে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী দাউদা জালো অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে মিয়ানমারের অপরাধগুলো তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে জানান, মিয়ানমার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের ‘ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তু’ (Target for destruction) হিসেবে বেছে নিয়েছিল। গাম্বিয়ার দাবি, এটি কেবল অভ্যন্তরীণ কোনো অভিযান ছিল না, বরং একটি নির্দিষ্ট Minority বা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে নির্মূল করার চূড়ান্ত অপচেষ্টা ছিল। শুক্রবার থেকে মিয়ানমারের আইনজীবী দল এই অভিযোগের বিপরীতে তাদের চূড়ান্ত জবাব পেশ করা শুরু করবে।
বৈশ্বিক গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম আন্তর্জাতিক আদালত একটি পূর্ণাঙ্গ গণহত্যার মামলা গ্রহণ করেছে। এই মামলার রায় কেবল মিয়ানমারের জন্যই নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা মামলার গতিপ্রকৃতি ভবিষ্যতে গাজায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। Human Rights বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হেগের এই আদালতের রায় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সূত্র: আল জাজিরা