• প্রযুক্তি
  • লাল গ্রহে স্বপ্নের বসতি: পৃথিবীর দুই অণুজীবের হাত ধরেই কি মঙ্গলে পা রাখবে মানুষ?

লাল গ্রহে স্বপ্নের বসতি: পৃথিবীর দুই অণুজীবের হাত ধরেই কি মঙ্গলে পা রাখবে মানুষ?

প্রযুক্তি ১ মিনিট পড়া
লাল গ্রহে স্বপ্নের বসতি: পৃথিবীর দুই অণুজীবের হাত ধরেই কি মঙ্গলে পা রাখবে মানুষ?

প্রতিকূল পরিবেশ জয় করে অক্সিজেন উৎপাদন ও ঘরবাড়ি নির্মাণে যুগান্তকারী দিশা দেখাচ্ছেন গবেষকরা; মহাকাশ বিজ্ঞানে 'Biocementation' বিপ্লবের হাতছানি।

মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে লাল গ্রহ 'মঙ্গল' সবসময়ই এক রহস্যময় আকর্ষণের নাম। পৃথিবীর বিকল্প হিসেবে মঙ্গলে মানব বসতি স্থাপনের স্বপ্ন বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই দেখে আসছেন। তবে প্রতিকূল বায়ুমণ্ডল, অক্সিজেনের অভাব এবং অসহনীয় বিকিরণের কারণে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ ছিল। এবার সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার পথে অভাবনীয় এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছেন গবেষকরা। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে বিদ্যমান দুটি অতি ক্ষুদ্র অণুজীবই হতে পারে মঙ্গলে মানুষের নিরাপদ আবাসন গড়ার মূল চাবিকাঠি।

'বায়োসিমেন্টেশন': মঙ্গলের ধূলিকণায় তৈরি হবে মজবুত অট্টালিকা

মঙ্গল গ্রহে ঘরবাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো নির্মাণসামগ্রীর অভাব। পৃথিবী থেকে ইট, বালু বা সিমেন্ট বয়ে নিয়ে যাওয়া প্রযুক্তিগত ও আর্থিকভাবে প্রায় অসম্ভব। এই সংকটের সমাধান দেবে 'Sporosarcina pasteurii' নামক একটি বিশেষ অণুজীব। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অণুজীবটি 'Ureolysis' নামক এক বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্যালসিয়াম কার্বনেট তৈরি করতে সক্ষম। মঙ্গলের আলগা ধূলিকণার সঙ্গে এই অণুজীবের বিক্রিয়া ঘটিয়ে সেটিকে কংক্রিটের মতো শক্ত উপাদানে রূপান্তর করা যাবে। এই পদ্ধতিতে তৈরি হওয়া 'Biocement' মঙ্গলের বুকে শক্তিশালী ও স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে বিপ্লব ঘটাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অক্সিজেন সংকট নিরসনে 'সায়ানোব্যাকটেরিয়া'

মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত পাতলা এবং সেখানে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের আধিক্য থাকলেও শ্বাস নেওয়ার মতো অক্সিজেন নেই। এই প্রাণঘাতী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষকরা 'Chroococcidiopsis' নামক এক ধরনের 'Cyanobacteria' বা নীল-সবুজ শৈবালকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছেন। এই অণুজীবটি পৃথিবীর চরম প্রতিকূল এবং উচ্চ বিকিরণপূর্ণ (Cosmic Radiation) পরিবেশে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় এটি মঙ্গলের কার্বন-ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে জীবনদায়ী অক্সিজেন উৎপাদন করতে পারবে। ফলে কৃত্রিম উপায়ে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রাকৃতিকভাবেই মঙ্গলে শ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

খরচ হ্রাসে ‘In-situ Resource Utilization’ কৌশল

মহাকাশ গবেষণায় 'Cost-effectiveness' একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, পৃথিবী থেকে মাত্র এক কেজি ওজনের কোনো বস্তু মঙ্গলে পাঠাতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হয়। এই বিশাল ব্যয়ভার বহন করে মঙ্গলে শহর গড়া একপ্রকার অলীক কল্পনা। কিন্তু এই দুই অণুজীব ব্যবহারের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা 'In-situ Resource Utilization' (ISRU) বা স্থানীয় সম্পদের ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। মঙ্গলের মাটি ব্যবহার করেই যদি নির্মাণকাজ চালানো যায়, তবে পৃথিবী থেকে ভারী উপকরণ পাঠানোর ব্যয় শূন্যে নেমে আসবে। এটি কেবল সাশ্রয়ীই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী মানব বসতির জন্য সবচেয়ে টেকসই সমাধান।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও প্রতিকূলতা জয়

বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘Frontiers in Microbiology’-তে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, মঙ্গলের প্রচণ্ড মহাজাগতিক বিকিরণ এবং হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রা থেকে বাঁচতে এই অণুজীবের সহায়তায় তৈরি পুরু দেয়ালের আবাসন অত্যন্ত কার্যকর হবে। তবে ল্যাবরেটরির এই সাফল্য মঙ্গলের রুক্ষ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে আরও নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। যদি এই প্রকল্প সফল হয়, তবে কয়েক দশকের মধ্যেই হয়তো লাল গ্রহে মানুষের পদচিহ্ন কেবল ভ্রমণের জন্য নয়, স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পড়তে শুরু করবে।

Tags: space science mars colonization biocementation cyanobacteria planetary habitability mars mission astrobiology red planet oxygen production space construction