সত্তরের দশকের ইসলামি বিপ্লবের পর বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন এবং অস্থির সময় পার করছে ইরান। একদিকে দেশের অভ্যন্তরে সরকার পতন আন্দোলনের তীব্রতা, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হামলার আশঙ্কা—এই দুই সংকটের মুখে পড়ে নিজেদের আকাশপথ (Airspace) পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করেছে তেহরান। পেন্টাগন ইতিমধ্যে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর একটি তালিকা প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে জমা দিয়েছে বলে খবর চাউর হতেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে।
পেন্টাগনের তালিকায় ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগন ইরানের একাধিক সেনা ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র (Missile Base) এবং বিতর্কিত পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে (Nuclear Center) সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু (Target List) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইতিপূর্বেই ইরান ইস্যুতে সামরিক হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিলেন। পেন্টাগনের এই তৎপরতা সেই হুঁশিয়ারিরই বাস্তব প্রতিফলন বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আংশিক সেনা ও অসামরিক কর্মীদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে, যা কোনো বড় ধরনের অভিযানের পূর্বপ্রস্তুতি বা 'Strategic Repositioning' হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ দমনপীড়ন ও বিচারবিভাগের কঠোর অবস্থান
ইরানের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন পুরোদস্তুর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলন দমাতে ইরান সরকার বিন্দুমাত্র নমনীয়তা দেখাচ্ছে না। দেশটির প্রধান বিচারপতি সাফ জানিয়েছেন, রাজপথে নাশকতা ও অগ্নিসংযোগে জড়িতদের দ্রুততম সময়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, 'বিচারে বিলম্ব বিচারহীনতার শামিল', তাই সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর করে আন্দোলনকারীদের দমানোর কৌশল নিয়েছে তেহরান। তবে এর মধ্যেই ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে ইরান সরে এসেছে। যদিও তেহরান থেকে এই দাবির কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি।
প্রতিবেশীদের কড়া হুঁশিয়ারি ও সৌদির প্রতিক্রিয়া
মার্কিন হামলা ঠেকাতে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা সৌদি আরবের ভূখণ্ড বা আকাশপথ ব্যবহার করে যদি মার্কিন বাহিনী ইরানে কোনো আঘাত হানে, তবে ওই দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও পাল্টা হামলা (Counter-attack) চালানো হবে। এই কড়া বার্তার পর রিয়াদ দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সৌদি আরব তেহরানকে আশ্বস্ত করে বলেছে, তাদের আকাশপথ ব্যবহার করে ইরানে কোনো হামলা করতে দেওয়া হবে না। এর ফলে অঞ্চলটিতে আপাতত একটি সরাসরি সংঘাত এড়ানো সম্ভব হলেও উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি।
ভেস্তে গেল কূটনৈতিক আলোচনা
যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়াতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোপনে যে সীমিত কূটনৈতিক যোগাযোগ (Diplomatic Channels) ছিল, তা এখন পুরোপুরি বন্ধ। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত আলোচনাটি স্থগিত করা হয়েছে। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটন যখন একদিকে সামরিক হুমকির 'Target List' তৈরি করছে, তখন আলোচনার কোনো পরিবেশ থাকতে পারে না।
বিশ্বজুড়ে সংহতি ও পাল্টা বিক্ষোভ
ইরান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব জনমত এখন দ্বিধাবিভক্ত। জার্মানির বার্লিনে হাজার হাজার প্রবাসী ইরানি রাজপথে নেমে আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং একটি বিশাল পদযাত্রা করেছেন। অন্যদিকে, তেহরানে ব্রিটিশ দূতাবাসের সামনে জড়ো হয়ে সরকারি সমর্থকদের বড় একটি অংশ বিক্ষোভ করেছে। সেখানে 'যুক্তরাষ্ট্র নিপাত যাক' এবং 'ইসরায়েল নিপাত যাক' স্লোগানে রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে, ইরানের আকাশে এখন যুদ্ধের ঘনঘটা। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন নাকি বাইরের আক্রমণ প্রতিহত করা—কোনটি তেহরানের অগ্রাধিকার হবে, তা নিয়েই এখন চলছে বিশ্বজুড়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ।