• ব্যবসায়
  • সাতক্ষীরায় কুল চাষে অভাবনীয় সাফল্য: ১৬০ কোটি টাকার ‘মার্কেট ভ্যালু’ ছোঁয়ার হাতছানি

সাতক্ষীরায় কুল চাষে অভাবনীয় সাফল্য: ১৬০ কোটি টাকার ‘মার্কেট ভ্যালু’ ছোঁয়ার হাতছানি

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
সাতক্ষীরায় কুল চাষে অভাবনীয় সাফল্য: ১৬০ কোটি টাকার ‘মার্কেট ভ্যালু’ ছোঁয়ার হাতছানি

আমের পর এবার ‘ক্যাশ ক্রপ’ হিসেবে কুলের বাজিমাত; দেশজুড়ে সাতক্ষীরার কুলের ব্যাপক চাহিদা এবং বাণিজ্যিক প্রসারে উজ্জ্বল হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি।

হিমসাগর আর ল্যাংড়া আমের সুখ্যাতি ছাড়িয়ে সাতক্ষীরা এখন কুলের জনপদ হিসেবেও নিজের অবস্থান সুসংহত করছে। চলতি মৌসুমে জেলায় কুলের বাম্পার ফলন হওয়ায় উচ্ছ্বসিত চাষি ও ব্যবসায়ীরা। কৃষি সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, এবার সাতক্ষীরা থেকে উৎপাদিত কুলের সামগ্রিক ‘Market Value’ বা বাজারমূল্য ১৫০ থেকে ১৬০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। মূলত আমের পর উচ্চমূল্যের ‘Commercial Farming’ বা বাণিজ্যিক চাষাবাদ হিসেবে কুলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই অঞ্চলে এক নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটে গেছে।

আগাম ফলন ও দেশজুড়ে চাহিদা

ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সাতক্ষীরায় কুল আগে পাকে। ফলে মৌসুমের শুরুতেই বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে এই জেলার ফল। বর্তমানে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন শত শত ট্রাকভর্তি কুল রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। জেলার সাতটি উপজেলাতেই কুলের আবাদ হলেও কলারোয়া, তালা ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় উৎপাদনের হার সবচেয়ে বেশি।

বৈচিত্র্যময় জাত ও বাজার দর

সাতক্ষীরার বাগানগুলোতে এখন রঙিন কুলের সমারোহ। এর মধ্যে নারিকেল কুল, টক কুল, থাই আপেল কুল এবং বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ‘বল সুন্দরী’ জাতের কুলের ফলন চোখে পড়ার মতো। বাগান মালিক ও শ্রমিকরা এখন চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন ফল সংগ্রহ ও গ্রেডিংয়ের কাজে। সরাসরি বাগান থেকেই পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা প্রতি কেজি কুল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং মানভেদে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে কিনে নিচ্ছেন। এই উচ্চমূল্য চাষিদের জন্য বড় ধরনের ‘Profit Margin’ নিশ্চিত করছে।

চাষিদের অভিজ্ঞতায় কুলের অর্থনীতি

তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা এলাকার সফল কুলচাষি আব্দুস সমাদ মোড়ল জানান, মাত্র তিন বিঘা দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে তিনি সাত বিঘা জমিতে কুলের আবাদ করছেন। তার মতে, প্রতি বিঘা জমিতে দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকার কুল উৎপাদন সম্ভব। একই সুর শোনা গেল চাষি আব্দুস ছালামের কণ্ঠেও। তিনি জানান, ধান বা অন্যান্য সনাতন ফসলের তুলনায় কুল চাষ অনেক বেশি লাভজনক এবং এতে ঝুঁকির পরিমাণও তুলনামূলক কম।

কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ উন্নয়ন

কুলের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল চাষিদের ভাগ্য ফেরায়নি, তৈরি করেছে নতুন ‘Job Creation’-এর সুযোগ। বাগানে পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ এবং প্যাকেটজাত করার কাজে নিয়োজিত হয়ে শত শত নারী ও পুরুষ শ্রমিকের অন্নসংস্থান হচ্ছে। স্থানীয় শ্রমিকরা জানান, কুলের মৌসুমে কাজের সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় তাদের পারিবারিক সচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

কৃষি বিভাগের পর্যবেক্ষণ ও পরিসংখ্যান

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম জানান, কুল চাষ বর্তমানে এই অঞ্চলের একটি অন্যতম ‘Cash Crop’ বা অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, “কুল বাগানের ভেতরেই সাথী ফসল হিসেবে শাক-সবজি চাষ করা যায়, যাকে আমরা ‘Intercropping’ বলি। এই দ্বিমুখী আয়ের সুযোগ থাকায় জেলার কৃষকরা কুল চাষে অধিক আগ্রহী হচ্ছেন।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, গত বছর সাতক্ষীরায় ৮৩০ হেক্টর জমিতে কুলের আবাদ হয়েছিল। কুলের উচ্চ চাহিদা ও লাভজনক হওয়ায় চলতি মৌসুমে আবাদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪৬ হেক্টরে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং মানসম্মত বীজের ব্যবহারের ফলে এবার ফলনের গুণগত মানও অনেক উন্নত। ধারণা করা হচ্ছে, ১৬০ কোটি টাকার এই বাণিজ্যিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে সাতক্ষীরার কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন মাইলফলক স্থাপিত হবে।

Tags: market value agriculture news satkhira kul plum harvest cash crop ball sundari apple kul bangladesh farming export quality village economy