ইরানে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং তেহরানের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হামলার প্রচ্ছন্ন হুমকির প্রেক্ষাপটে এক জরুরি অধিবেশনে মিলিত হয়েছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) আয়োজিত এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা তীব্র বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, যা বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘের ১৫ সদস্যের শক্তিশালী এই নিরাপত্তা পরিষদে বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি।
ইরানের চরম হুঁশিয়ারি: 'অনুচ্ছেদ ৫১' প্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত
বৈঠকে ইরানের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি গোলাম হোসেন দারজি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে এবং বিক্ষোভকারীদের উসকে দিয়ে অস্থিরতা তৈরি করছে। দারজি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, ইরান কোনো ধরণের স্বতঃস্ফূর্ত সংঘাত চায় না, তবে দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এলে তারা চুপ করে থাকবে না।
তিনি জাতিসংঘ সনদের ‘Article 51’ (অনুচ্ছেদ ৫১) উল্লেখ করে বলেন, কোনো ধরণের বহিঃশত্রুর আগ্রাসন মোকাবিলায় ইরান চূড়ান্ত এবং আইনানুগ জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। মার্কিন হুমকিকে ‘বেআইনি’ আখ্যা দিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির জন্য এককভাবে ওয়াশিংটনকেই দায়ভার বহন করতে হবে।
ওয়াশিংটনের কড়া বার্তা: 'সব অপশনই টেবিলে আছে'
অন্যদিকে, জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ ইরানের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে পাল্টা আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন। তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, ইরানে বর্তমানে যে ‘Internet Blackout’ বা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে, তার ফলে সেখানে সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়নের প্রকৃত চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাতে পারছে না।
ওয়াল্টজ বলেন, “ইরানের সাধারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় স্বাধীনতার দাবি জানাচ্ছে। বর্তমান সরকার বিক্ষোভকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চালানোর যে চেষ্টা করছে, তা মূলত নিজেদের জনগণের প্রতি শাসকগোষ্ঠীর গভীর ভীতির বহিঃপ্রকাশ।”
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান পরিষ্কার করে মার্কিন দূত বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো অন্তহীন আলোচনার প্রথাগত ধারায় বিশ্বাসী নন, তিনি সরাসরি পদক্ষেপে বিশ্বাসী। ইরানে সাধারণ মানুষের ওপর চলমান হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং এই লক্ষ্যে সামরিক হস্তক্ষপসহ ‘All Options are on the Table’ বা সব ধরণের পথই খোলা রাখা হয়েছে।”
তথ্য বিভ্রাট ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও দাবি করেন যে, ইরান বর্তমানে অভ্যন্তরীণভাবে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, “বিশ্ববাসীর জানা উচিত, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী জনশক্তির উত্তাল তরঙ্গে দিশেহারা। তারা নিজেদের পতন ঠেকাতে মিথ্যে বয়ান তৈরি করছে।”
নিরাপত্তা পরিষদের এই বিতর্ক স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ শক্তিটির সাথে পশ্চিমা বিশ্বের বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব এখন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই উত্তজনা প্রশমিত না হয়, তবে পুরো অঞ্চল একটি দীর্ঘমেয়াদী Military Conflict বা সামরিক সংঘাতের মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে ইরানের রাজপথে চলা বিক্ষোভ এবং তার বিপরীতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অবস্থান নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘের এই বৈঠক কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান দিতে না পারলেও, এটি বিশ্বশক্তির মেরুকরণকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।