আফগানিস্তান ক্রিকেটের উত্থানের গল্পের অন্যতম প্রধান কারিগর এবং ২০১৫ বিশ্বকাপের সেই অবিস্মরণীয় জয়ের নায়ক শাপুর জাদরান এখন জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি। মাঠের ক্রিকেটে বাঘা বাঘা ব্যাটারদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করা এই দীর্ঘদেহী ফাস্ট বোলার (Fast Bowler) বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শায়িত। তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
চিকিৎসায় উদ্বেগ: শ্বেত রক্তকণিকার বিপজ্জনক পতন
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ৩৮ বছর বয়সী শাপুর গত কিছুদিন ধরেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ১২ জানুয়ারি তাঁর ভাই ঘামাই জাদরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (Social Media) এক আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে ভক্তদের জানান যে, শাপুর বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
আফগান ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, শাপুরের রক্তে শ্বেত রক্তকণিকার (White Blood Cell) মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে অত্যন্ত গুরুতর 'Health Emergency' হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে তাঁর অসুস্থতার মূল কারণ সম্পর্কে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মেডিকেল রিপোর্ট (Medical Report) প্রকাশ করা হয়নি, যা ভক্তদের মধ্যে দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রশিদ লতিফসহ ক্রিকেট বিশ্বের প্রার্থনা
শাপুরের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই শোকাতুর ক্রিকেট বিশ্ব। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফ এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে শাপুরের জন্য দোয়া চেয়ে লিখেছেন, “যিনি সবসময় সিংহের হৃদয় নিয়ে মাঠে লড়েছেন, আজ তাঁর নিজের জীবনযুদ্ধের জন্য আমাদের সবার দোয়া ও সমর্থন প্রয়োজন।” রশিদ লতিফের এই বার্তার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটার এবং সমর্থকরা তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনায় পোস্ট করছেন।
আফগান ক্রিকেটের উত্থান ও সেই ঐতিহাসিক মহাকাব্য
আফগানিস্তানের যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রেক্ষাপটে যখন ক্রিকেট অবকাঠামো বলতে কিছুই ছিল না, তখন যে কজন তরুণ ক্রিকেটকে বিশ্ব মানচিত্রে তুলে ধরার স্বপ্ন দেখেছিলেন, শাপুর জাদরান তাঁদের অগ্রগণ্য। ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া এই পেসার প্রায় এক দশক দাপটের সঙ্গে বোলিং করেছেন। ৪৪টি ওয়ানডে ও ৩৬টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মোট ৮০টি আন্তর্জাতিক উইকেটের মালিক তিনি।
তবে তাঁর ক্যারিয়ারের চিরস্মরণীয় মুহূর্তটি আসে ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে (World Cup)। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে যখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিল আফগানিস্তান, তখন শেষ ব্যাটার হিসেবে মাঠে নেমে শাপুর কেবল বল হাতেই ভূমিকা রাখেননি, বরং ব্যাট হাতে জয়সূচক রানটি করে দেশকে এনে দিয়েছিলেন বিশ্বকাপে প্রথম জয়ের স্বাদ। সেই জয়ের পর দুই হাত ছড়িয়ে তাঁর উল্লাসের দৃশ্যটি আজও আফগান ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ফ্রেম হিসেবে বিবেচিত।
অবসরের ঠিক পরেই জীবনযুদ্ধ
অত্যন্ত লড়াকু এই পেসার দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষে চলতি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেই সব ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। মাঠের লড়াই শেষ করে বিশ্রামে যাওয়ার আগেই এই মরণঘাতী শারীরিক বিপর্যয় নেমে এলো তাঁর জীবনে। ক্রিকেট ভক্তদের এখন একটাই প্রার্থনা—মাঠের মতো জীবনের এই ক্রিজেও বাউন্সার সামলে দ্রুত ‘ম্যাচ জয়ী’ (Match Winner) হয়ে ফিরবেন শাপুর জাদরান।