• দেশজুড়ে
  • ‘একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই সরকারকে সত্য কথা বলে’: গণমাধ্যম সম্মিলনে মাহফুজ আনাম

‘একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই সরকারকে সত্য কথা বলে’: গণমাধ্যম সম্মিলনে মাহফুজ আনাম

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
‘একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই সরকারকে সত্য কথা বলে’: গণমাধ্যম সম্মিলনে মাহফুজ আনাম

ডেইলি স্টার সম্পাদকের মন্তব্য—দলীয় লোক, ব্যুরোক্রেসি বা ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি সরকারকে সত্য বলবে না; গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ‘এথিক্যাল জার্নালিজম’-এর মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের আহ্বান।

সরকার যদি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে এবং সেই উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি রাখে, তবে তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, “স্বাধীন সাংবাদিকতা হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা সরকারকে সত্য কথা বলে।”

আজ শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে (কেআইবি) আয়োজিত ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন। সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব - NOAB) এবং সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ যৌথভাবে মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সংগঠিত হামলার প্রতিবাদ জানাতে এই সম্মিলনের আয়োজন করে।

প্রশংসার জগৎ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ

মাহফুজ আনাম বলেন, “সরকার, আপনি মনে রাখবেন আপনাকে কেউ সত্য কথা বলবে না। আপনার দলীয় লোকেরা বলবে না ভয়ে এবং আপনার সরকারের ব্যুরোক্রেসি (Bureaucracy) বলবে না। আপনার সরকারের ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি (Intelligence Community) বলবে না। তারা সব সময় আপনাকে প্রশংসার মধ্যে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখবে।”

তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প ও বাজেট নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার মাধ্যমে উঠে আসে, তা ছাড়া আর কে বলবে? তিনি বলেন, “আপনি যে বাজেট নিয়ন্ত্রণ করেন লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট। আপনি এক মুহূর্তের জন্য মনে করবেন না, এই টাকা আপনার। এই টাকা হচ্ছে ট্যাক্স পেয়ারদের (Tax Payers), এই টাকা হচ্ছে জনগণের।”

ডেইলি স্টার সম্পাদক স্পষ্ট করে বলেন, সরকার যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তাতে দুর্নীতি (Corruption) হচ্ছে কি না বা জনগণের কাছে তা গ্রহণযোগ্য কি না, সে কথা স্বাধীন সাংবাদিকতাই বলবে।

গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও ‘Ethical Journalism’-এর গুরুত্ব

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুনভাবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা (Re-establishment of Democracy) করার সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, “জবাবদিহিমূলক সমাজ (Accountable Society) প্রতিষ্ঠা করার সময় এসেছে।” একইভাবে সাংবাদিকতার একটা নতুন গণতান্ত্রিক, বলিষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ, ‘এথিক্যাল জার্নালিজম’ (Ethical Journalism) করার একটা সময় এসেছে। তিনি সবাইকে জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সাংবাদিকতা শুধু একটি চাকরি নয়; এটি মূলত একটি সমাজসেবামূলক পেশা (Social Service)। গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, বৈষম্য দূরীকরণ এবং সব ধর্ম ও গোষ্ঠীর মানুষের সমান অধিকারের পক্ষে কাজ করাই সাংবাদিকতার মূল মন্ত্র।

সাংবাদিকতা ও বিচার বিভাগের বিশেষ সুরক্ষা

মাহফুজ আনাম সংবিধানের কথা উল্লেখ করে বলেন, সংবিধানে মাত্র দুটি পেশাকে বিশেষ সুরক্ষা (Special Protection) দেওয়া হয়েছে—স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বাধীন গণমাধ্যম। তিনি ব্যাখ্যা করেন, যেসব সমাজে সাংবাদিকতা শক্তিশালী ও স্বাধীন, সেসব সমাজে গণতন্ত্র সুদৃঢ় হয় এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

তিনি বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা পরস্পরের পরিপূরক (Complementary)। তিনি অনুরোধ জানান, ‘কোর্ট অব কনটেম্পটের’ (Court of Contempt) মতো ক্ষমতা যেন স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধে ব্যবহার করা না হয়।

পেশাগত নৈতিকতা ও মালিকদের প্রতি বার্তা

নিজেদের পেশাগত নৈতিকতা (Professional Ethics) সম্পর্কে সাংবাদিকদের উদ্দেশে মাহফুজ আনাম বলেন, সততা, নিষ্ঠা এবং সঠিক, স্বাধীন সাংবাদিকতা করার মৌলিক ‘এথিক্যাল ভ্যালু’ (Ethical Value) নিজের জীবনে ও চেতনায় সব সময় ধরে রাখতে হবে।

তিনি মালিকদের উদ্দেশে বলেন, অন্যান্য শিল্প খাতে বিনিয়োগের মতো মানসিকতা নিয়ে গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করা হলে গণমাধ্যম কখনোই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে না। সাংবাদিকতাকে তিনি সমাজের ‘সামাজিক ডাক্তার’ (Social Doctor) হিসেবে তুলনা করেন। তাঁর মতে, ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য সাংবাদিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করা হলে তা জনগণ গ্রহণ করবে না।

গণমাধ্যম সম্মিলনে নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদের সব সদস্যসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সংগঠনগুলোর নেতারা অংশ নিয়েছেন।

Tags: democracy accountability noab editors guild mahfuz anam independent journalism freedom of press ethical journalism media investment constitutional protection