ট্যাগাটোজ কী এবং কেন এটি বিশেষ?
চিনি এবং কৃত্রিম সুইটেনারযুক্ত খাবারকে স্বাস্থ্যকর করার চেষ্টা অনেক দিনের। তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে দেখা যাচ্ছে, জনপ্রিয় অনেক শূন্য ক্যালরির কৃত্রিম সুইটেনারও স্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীরা নতুন প্রাকৃতিক চিনি ট্যাগাটোজের সন্ধান পেয়েছেন। স্বাদের দিক থেকে এটি সাধারণ টেবিল চিনির প্রায় ৯২ শতাংশ মিষ্টি হলেও ক্যালরি মাত্র এক-তৃতীয়াংশের মতো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি গ্রহণ করলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে না।
উৎপাদন প্রক্রিয়া ও সহজলভ্যতা
ট্যাগাটোজ প্রকৃতিতে খুবই বিরল। এটি কিছু দুগ্ধজাত খাবার এবং ফলের মধ্যে অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়। এর বাজার এতদিন বিস্তৃত না হওয়ার প্রধান কারণ ছিল উৎপাদন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং উচ্চ খরচ। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কয়েকটি বায়োটেকনোলজি (জৈবপ্রযুক্তি) প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রাথমিক গবেষণা চালিয়েছেন। এতে দেখা গেছে, পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর উপায়ে বড় পরিসরে ট্যাগাটোজ উৎপাদন করা সম্ভব। গবেষকরা ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে বিশেষ এনজাইম ব্যবহার করে গ্লুকোজকে ধাপে ধাপে ট্যাগাটোজে রূপান্তর করার একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যার সাফল্যের হার প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্যের উপর ট্যাগাটোজের প্রভাব
সাধারণ চিনি ও কৃত্রিম সুইটেনারের তুলনায় ট্যাগাটোজ তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত, কারণ সেগুলো রক্তে ইনসুলিন দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ট্যাগাটোজের একটি বড় অংশ বৃহদন্ত্রে গাঁজন প্রক্রিয়ায় ভেঙে যায়। ক্ষুদ্রান্ত্র দিয়ে এটি অল্প পরিমাণে রক্তে শোষিত হয়, যে কারণে ইনসুলিনের ওপর এর প্রভাব কম। তবে, শরীরে এটি অনেকটা ফলের চিনি ফ্রুক্টোজের মতো ভাঙে, তাই যাদের ফ্রুক্টোজ সহ্য হয় না, তাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ট্যাগাটোজকে সাধারণভাবে নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
দাঁতের সুরক্ষা ও অন্যান্য ব্যবহার
এই চিনির আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো এটি দাঁতের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। সাধারণ চিনি মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটিয়ে দাঁতের ক্ষয় বাড়ায়। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, ট্যাগাটোজ সেই ক্ষতিকর জীবাণুর বৃদ্ধি সীমিত করতে পারে এবং মুখের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য এটি ভালো হতে পারে। এছাড়া, অনেক কৃত্রিম সুইটেনারের ক্ষেত্রে যা সম্ভব নয়, তা হলো—ট্যাগাটোজ দিয়ে বেক করা খাবার তৈরি করা যায়। ফলে বিস্কুট, কেক বা অন্যান্য বেকারি পণ্যে এটি ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
গবেষণা দল জানিয়েছে, উৎপাদন প্রক্রিয়াটি আরও উন্নত করার কাজ চলছে। ভবিষ্যতে এই কৌশল ব্যবহার করে ট্যাগাটোজ ছাড়াও অন্যান্য বিরল ও উপকারী চিনি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, আগামী এক দশকের মধ্যে বিশ্ববাজারে ট্যাগাটোজের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এই গবেষণা দেখায়, স্বাস্থ্যসম্মত মিষ্টির বিকল্প খোঁজার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
ট্যাগাটোজ, তার কম ক্যালরি, কম ইনসুলিন প্রতিক্রিয়া, দাঁতের জন্য নিরাপত্তা এবং রান্নার উপযোগীতার কারণে ভবিষ্যতের খাদ্যশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এটি ব্যাপকভাবে বাজারে আসতে সময় নিলেও, ডায়াবেটিস এবং স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের জন্য এটি একটি আশাব্যঞ্জক প্রাকৃতিক সমাধান হতে পারে।
(সূত্র: Science Alert)