বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে একক আধিপত্যের পর এবার স্বর্ণ খাতের ‘গ্লোবাল প্লেয়ার’ হওয়ার পথে বড় এক ধাপ এগিয়ে গেল সৌদি আরব। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত খনি কোম্পানি ‘সৌদি অ্যারাবিয়ান মাইনিং কোম্পানি’ বা মা’আদেন (Ma’aden) নতুন করে ২ লাখ ২১ হাজার কেজি (প্রায় ৭৮ লাখ আউন্স) স্বর্ণসম্পদ বা ‘Gold Resources’ আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। এই বিশাল খনিজ ভাণ্ডার উন্মোচনের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক খনিজ বাজারে (Global Mineral Market) নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার ইঙ্গিত দিল মরু রাষ্ট্রটি।
চারটি নতুন খনি ও বিপুল মজুতের সমীকরণ
শনিবার গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মা’আদেনের নিবিড় এবং লক্ষ্যভিত্তিক খনন কার্যক্রমের (Targeted Drilling) মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৯০ লাখ আউন্স স্বর্ণের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বার্ষিক প্রতিবেদন ও মানদণ্ড অনুযায়ী চুলচেরা বিশ্লেষণের পর ৭৮ লাখ আউন্স বা ২ লাখ ২১ হাজার কেজি স্বর্ণের চূড়ান্ত মজুত তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
এই সম্প্রসারণের আওতায় প্রধানত চারটি এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে: ১. মানসুরাহ–মাসারাহ (Mansourah-Massarah) ২. উরুক ২০/২১ (Uruq 20/21) ৩. উম্ম আস সালাম (Umm as Salam) ৪. ওয়াদি আল জাওয়ান (Wadi Al Jawan)
এর মধ্যে ওয়াদি আল জাওয়ানে প্রথমবারের মতো প্রায় ৩০ লাখ ৮০ হাজার আউন্স স্বর্ণের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছে।
দূরদর্শী কৌশলের সুফল: সিইও বব উইল্ট-এর বক্তব্য
মা’আদেনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) বব উইল্ট এই সাফল্যকে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার একটি বড় বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “এই ফলাফল আমাদের ‘Long-term Strategy’ বা দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের কার্যকারিতা প্রমাণ করে। সৌদি আরবের খনিজ সম্পদ উন্মোচনে আমরা যে বড় বিনিয়োগ করছি, তা এখন বাস্তব রূপ নিচ্ছে। এই আবিষ্কার আমাদের ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহ (Cash Flow) নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকল্প পাইপলাইনকে আরও শক্তিশালী করবে।”
স্বর্ণ ছাপিয়ে তামা ও নিকেলের দিকে নজর
সৌদি আরবের এই খনিজ বিপ্লব কেবল স্বর্ণেই সীমাবদ্ধ নেই। বব উইল্ট আরও জানিয়েছেন, ‘আরবিয়ান শিল্ড’ (Arabian Shield) অঞ্চলে তামা (Copper) ও নিকেলের (Nickel) মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর প্রাথমিক ফলাফলও বেশ আশাব্যঞ্জক। ভিশন ২০৩০ (Vision 2030) এর লক্ষ্য পূরণে সৌদি আরব তার অর্থনীতিকে কেবল তেলের ওপর নির্ভরশীল না রেখে খনিজ ও শিল্পখাতের দিকে বহুমুখীকরণ (Diversification) করছে।
মানসুরাহ–মাসারাহ: স্বর্ণ উৎপাদনের মূল কেন্দ্র
বর্তমান আবিষ্কারের মধ্যে মানসুরাহ–মাসারাহ প্রকল্পটি অন্যতম সম্ভাবনাময়। বর্তমানে এখানে আনুমানিক ১১ কোটি ৬০ লাখ টন আকরিক রয়েছে, যার প্রতি টনে গড়ে ২.৮ গ্রাম স্বর্ণ পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে এই একক খনিতেই প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ আউন্স স্বর্ণের মজুত রয়েছে। মজার বিষয় হলো, খনিটির গভীরে এখনও বিপুল খনিজ স্তর উন্মুক্ত রয়েছে, যা থেকে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের আবিষ্কার বা ‘Mega Discovery’ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখছেন ভূতাত্ত্বিকরা।
মা’আদেন জানিয়েছে, তাদের ২০২৬ সালের অনুসন্ধান কর্মসূচিতে ‘সেন্ট্রাল অ্যারাবিয়ান গোল্ড রিজিয়ন’-কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ডিজিটাল ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে খনির আয়ুষ্কাল বাড়ানো এবং উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ নিয়মিত চলবে।
এই বিশাল স্বর্ণ মজুত আবিষ্কারের খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরবের খনি খাতের ‘Market Value’ এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ করার সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।