• আন্তর্জাতিক
  • ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ কাতারের ব্যাংকে, ট্রাম্পের উদ্দেশ্য কী?

ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ কাতারের ব্যাংকে, ট্রাম্পের উদ্দেশ্য কী?

ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির প্রায় ৫০ কোটি ডলার কাতারের একটি ব্যাংকে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, পাওনাদারদের হাত থেকে অর্থ সুরক্ষিত রেখে তা ভেনেজুয়েলার উন্নয়নে ব্যবহার করাই এর লক্ষ্য। তবে সমালোচকেরা এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ কাতারের ব্যাংকে, ট্রাম্পের উদ্দেশ্য কী?

যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি শুরু করেছে এবং সেই বিক্রির অর্থ কাতারের একটি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের পেছনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্য হলো পশ্চিমা পাওনাদারদের নাগালের বাইরে ভেনেজুয়েলার তেল আয় রাখা এবং এই অর্থকে দেশটির খাদ্য ও নিরাপত্তা খাতে ব্যবহার নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ভেনেজুয়েলার জন্য এই অর্থপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ, যদিও এর স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

প্রেক্ষাপট: যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও তেল বিক্রি

ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি পুরোনো খবর হলেও, সেই বিক্রির অর্থ কাতারের ব্যাংকে জমা রাখার বিষয়টি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সিএনএন-এর সংবাদ অনুযায়ী, এই অর্থ দ্রুত ও ঝামেলাহীনভাবে ভেনেজুয়েলায় স্থানান্তরের জন্যই কাতারের ব্যাংকে রাখা হতে পারে। তবে এই ধরনের অর্থ গচ্ছিত রাখা কতটা নৈতিক, সে প্রশ্নও উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন যে ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রের অধীন থাকবে। দেশটি ইতোমধ্যে ৫০ কোটি ডলারের তেল বিক্রি করেছে, যার অর্থ কাতারের ব্যাংকে রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এটি কেবল শুরু এবং ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। যদিও তেল কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে।

অর্থ স্থানান্তরের কারণ ও ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন পশ্চিমা সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলা কার্যত বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দেশটির বিভিন্ন সরকার বিদেশি তেল কোম্পানি জব্দ করেছে, যার ক্ষতিপূরণ দাবি করছে বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিগুলো। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের তেলসম্পদ 'চুরি' করছে। তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছেন যে তেল বিক্রির এই অর্থ যেন সরাসরি ভেনেজুয়েলার জনগণের উপকারে আসে এবং পাওনাদারেরা যেন এর নাগাল না পায়। এই লক্ষ্যে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে ওই অর্থের ওপর কোনো ধরনের লিয়েন বা আইনি দাবি আরোপের চেষ্টা করা হলে তা অবরুদ্ধ থাকবে। আদেশটিতে আরও সতর্ক করা হয় যে এই অর্থ আইনি জটিলতামুক্ত না থাকলে তা ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় গুরুতর বাধা সৃষ্টি করবে। আর এ কারণেই পশ্চিমা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পাওনাদারদের নাগালের বাইরে রাখতেই কাতারের ব্যাংক হিসাবে এই অর্থ জমা রাখা হচ্ছে।

কাতারের ভূমিকা ও অর্থ বণ্টনের নির্দেশ

যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা সরকারের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করে আসছে। নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর তাদের ভূমিকা আরও বেড়েছে। বাইডেন প্রশাসনের সময়েও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে কাতারের ব্যাংকগুলো একই ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে কিছু তেল বিক্রির অর্থ ইরানে পাঠাতে সহায়তা করেছিল। লাতিন আমেরিকার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইকোঅ্যানালিটিকার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আলেহান্দ্রো গ্রিসান্তির মতে, কাতারের ব্যাংকগুলোতে রাখা এই অর্থ ভেনেজুয়েলার ব্যাংকগুলোর কাছে নিলামের মাধ্যমে ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে খাদ্য, ওষুধ ও ছোট ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গ্রিসান্তি আরও জানান, এই অর্থ ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংগ্রহ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী এটি বণ্টন করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট নিশ্চিত করেছেন যে এই অর্থ ভেনেজুয়েলা সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম, নিরাপত্তা ও খাদ্য সরবরাহে ব্যয় করা হবে।

স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ

তবে, ভেনেজুয়েলায় অর্থ পাঠানোর আগে কেন কাতারের ব্যাংকে রাখা হচ্ছে, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। একজন মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন। ট্রাম্পের নির্দেশে প্রশাসন দ্রুত কাজ করছে এবং বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করছে। তবে, বিশেষজ্ঞেরা বলছেন যে অর্থ কাতারে রাখা হলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আইনি চ্যালেঞ্জের আওতার বাইরে থাকে না, বরং অর্থ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বচ্ছতাও কমে যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যদি এই তহবিলের পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ্যে জানা না যায়, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যত “গোপন তহবিলের” মতো হয়ে উঠবে। অনেকে আশঙ্কা করছেন যে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ক্ষমতা ধরে রাখতে এই অর্থ ব্যবহার করে সরকারের দুর্নীতিগ্রস্ত অংশ, আধাসামরিক গোষ্ঠী ও মাদক কার্টেলকে উৎসাহিত করতে পারেন। ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন প্রশ্ন তুলেছেন—মার্কিন সামরিক বাহিনীর জব্দ করা সম্পদ বিক্রি করে প্রেসিডেন্ট নিজের নিয়ন্ত্রণে অফশোর হিসাব খুলবেন, এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এমন সিদ্ধান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকদের আকৃষ্ট করবে।

কেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ভেনেজুয়েলার তেল?

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক হলেও, তাদের উৎপাদিত তেল মূলত হালকা ও অপরিশোধিত ধরনের। কিন্তু দেশটির বেশিরভাগ তেল পরিশোধনাগারের জন্য প্রয়োজন হয় ভারী ও অপরিশোধিত তেল। দেশের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রকে এই ভারী অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই বাস্তবতা থেকে মুক্তি পেতে মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হাজার হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন, যা নিকট-ভবিষ্যতে কেউই করতে আগ্রহী নয়। তাই ভারী তেলের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রকে এখনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়। এই সমীকরণেই অনিবার্যভাবে চলে আসে ভেনেজুয়েলার নাম, কারণ কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভারী তেলের মজুত এই দেশটিতেই রয়েছে (স্কাই নিউজ সূত্রে)।

Tags: trump administration venezuela banking us foreign policy qatar oil world business