জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বের জনবহুল শহরগুলোতে বায়ুদূষণ এখন এক ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে মেগাসিটি ঢাকা এই দূষণের কবলে থাকলেও আজ রোববার (১৮ জানুয়ারি) বৈশ্বিক বায়ুমান সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী শহর দিল্লি ও লাহোরে রেকর্ড পরিমাণ দূষণ পরিলক্ষিত হয়েছে। ভয়াবহ দূষণে আচ্ছন্ন এই দুই শহরের তুলনায় ঢাকার অবস্থানও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়।
দিল্লি ও লাহোরে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার (IQAir)-এর রিয়েল-টাইম তথ্য অনুযায়ী, আজ সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ভারতের রাজধানী দিল্লি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে। দিল্লির Air Quality Index (AQI) স্কোর রেকর্ড ৬৩০, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ (Hazardous) হিসেবে বিবেচিত।
দিল্লির ঠিক পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর। শহরটির দূষণ স্কোর ৫৪৭, যা দিল্লির মতোই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ক্যাটাগরিতে পড়ে। মূলত শীতকালীন শুষ্ক আবহাওয়া এবং ধোঁয়াশার (Smog) কারণে এই অঞ্চলগুলোতে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এছাড়া ভারতের আরেক মহানগরী কলকাতা ২১৫ স্কোর নিয়ে দূষিত শহরের তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে।
ঢাকার বাতাসের মান: ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ স্তরে রাজধানী
বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় আজ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। আইকিউএয়ার সূচকে ঢাকার স্কোর ২৭৯। বায়ুমানের এই মাত্রাকে পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ (Very Unhealthy) বলা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা এই তালিকার শীর্ষ ১০-এর মধ্যে অবস্থান করছে, যা নগরবাসীর দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে নির্মাণাধীন মেগা প্রজেক্টের ধূলিকণা এবং যানবাহনের কালো ধোঁয়া ঢাকার বাতাসকে বিষিয়ে তুলছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দূষণের চিত্র
এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু শহরেও আজ বায়ুদূষণ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। চীনের শিল্পনগরী উহান ২২০ স্কোর নিয়ে তালিকার চতুর্থ এবং চেংডু ২০২ স্কোর নিয়ে সপ্তম স্থানে রয়েছে। চীনের চংচিং শহর ১৮২ স্কোর নিয়ে নবম অবস্থানে থাকলেও দেশটির অন্যান্য শহরের তুলনায় সেখানে দূষণের তীব্রতা কিছুটা কম।
এছাড়া ২০৭ স্কোর নিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সারাজেভো, ১৮৫ স্কোর নিয়ে অষ্টম অবস্থানে মিশরের কায়রো এবং ১৭৯ স্কোর নিয়ে দশম অবস্থানে রয়েছে ইথোপিয়ার আদ্দিস আবাবা।
একিউআই (AQI) সূচক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি: যা জানা জরুরি
বায়ু বিশেষজ্ঞরা একিউআই স্কোরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিরূপণ করেন:
০-৫০: ‘ভালো’ বা স্বাস্থ্যকর বাতাস।
৫১-১০০: ‘মাঝারি’ বা গ্রহণযোগ্য মান।
১০১-১৫০: সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য ‘অস্বাস্থ্যকর’।
১৫১-২০০: সরাসরি ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে গণ্য।
২০১-৩০০: ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’। এই অবস্থায় শিশু, প্রবীণ এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৩০১-এর বেশি: ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘Emergency’ অবস্থা। এটি বাসিন্দাদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মাস্ক ব্যবহার এবং যথাসম্ভব আউটডোর অ্যাক্টিভিটি বা বাড়ির বাইরের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে বায়ুবাহিত রোগের বিস্তার রোধে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি।