আসন্ন ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। রোববার (১৮ জানুয়ারি) এক বিশেষ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সরকারের এই অবস্থান কোনোভাবেই নিরপেক্ষতার লঙ্ঘন নয়, বরং এটি একটি সংস্কারমুখী সরকারের ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট (Mandate) বাস্তবায়নের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ ম্যান্ডেট ও দায়বদ্ধতা
প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কেবল দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা বা রুটিনমাফিক একটি সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য গঠিত হয়নি। দীর্ঘদিনের অপশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে একটি ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ফলে সরকারের মূল প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব (Institutional Responsibility) হলো রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য ‘রিফর্ম প্যাকেজ’ (Reform Package) বা সংস্কার কাঠামোর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বৈধতা পুনরুদ্ধার করা।
১৮ মাসের ধারাবাহিক আলোচনার প্রতিফলন: জুলাই সনদ
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, প্রধান উপদেষ্টা গত ১৮ মাস ধরে দেশের রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি, পেশাজীবী এবং তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে নিবিড় পরামর্শ করে এই সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছেন। এটি কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছা নয়, বরং জাতীয় ঐকমত্যের একটি ডিজিটাল ফ্রেমওয়ার্ক (Governance Framework)। ফলে নিজের তৈরি করা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে উঠে আসা সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া প্রধান উপদেষ্টার নৈতিক দায়িত্ব। একে পক্ষপাতিত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: যুক্তরাজ্য থেকে তুরস্কের উদাহরণ
আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার উদাহরণ টেনে প্রেস উইং জানায়, কোনো দেশের সরকারপ্রধান যখন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা নীতিগত পরিবর্তন (Policy Change) নিয়ে আসেন, তখন তার পক্ষে প্রচার চালানো একটি স্বীকৃত গণতান্ত্রিক রীতি। যুক্তরাজ্য, স্কটল্যান্ড, ফ্রান্স, তুরস্ক ও কিরগিজস্তানের মতো দেশেও সরকারপ্রধানরা বিভিন্ন গণভোটে প্রকাশ্যে নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। প্রেস উইংয়ের মতে, গণতান্ত্রিক বৈধতার মূল চাবিকাঠি হলো ভোটারদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ এবং পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
নীরবতা নয়, স্বচ্ছতাই নেতৃত্বের মূল চাবিকাঠি
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই মুহূর্তে নীরব থাকা নিরপেক্ষতার পরিচয় নয়, বরং তা হবে নেতৃত্বের ব্যর্থতা। যারা সংস্কারের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় বসেছেন, তাদের পক্ষে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এছাড়া এই গণভোটের ফলাফলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নিজস্ব ‘নির্বাচনী স্বার্থ’ (Electoral Interest) জড়িত নেই। সংস্কারটি জনগণের দ্বারা গৃহীত হোক বা প্রত্যাখ্যাত—তার চূড়ান্ত বাস্তবায়নের ভার থাকবে ভবিষ্যতে নির্বাচিত হতে যাওয়া সরকারের ওপর।
তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা ও প্রশাসনিক তৎপরতা
জেলা পর্যায়ে প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারি প্রচারণার বিষয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের কাজ হলো জনগণের কাছে এই জটিল রিফর্মের বিষয়বস্তু সহজভাবে ব্যাখ্যা করা। এটি কোনো দলীয় প্রচারণা নয়, বরং জনগণের সচেতন সিদ্ধান্ত (Informed Decision) নিতে সহায়তা করার একটি উদ্যোগ। সরকারের লক্ষ্য হলো অপপ্রচার রোধ করে একটি স্বচ্ছ ডাটা-ড্রিভেন (Data-driven) আলোচনা তৈরি করা।
বিবৃতির শেষে পুনরায় বলা হয়, সংস্কার প্রশ্নে দ্বিধা বা নীরবতা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত জনগণের হাতেই থাকবে এবং এটাই গণতন্ত্রের প্রকৃত নিশ্চয়তা। সরকারের এই ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার কেবল একটি আধুনিক ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র গঠনের বৈশ্বিক মানদণ্ড (International Standard) নিশ্চিত করার প্রয়াস।