তবে দেশের সরকারি হাসাপাতালগুলোতে রেডিওথেরাপি মেশিন সংকটের কারণে রোগীদের থেরাপি পেতে সিরিয়াল দিয়ে চার মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) কিশোরগঞ্জ জেলায় জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, দেশে প্রতি লাখে ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা ১০৬ জন। এ ছাড়া প্রতি বছর প্রতি লাখে নতুন করে ক্যানসার আক্রান্ত হচ্ছে ৫৩ জন। মোট মৃত্যুর ১২ শতাংশের জন্য দায়ী ক্যানসার।
দেশে অন্তত ৩৮ ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
এর মধ্যে শ্বাসনালি, স্তন, মুখ, পাকস্থলি এবং জরায়ু মুখের ক্যানসারের রোগী বেশি। ক্যানসার চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য রেডিওথেরাপি নেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ৮০ শতাংশ রোগীর চিকিৎসার জন্য অতি প্রয়োজনীয় রেডিওথেরাপি মেশিন রয়েছে একেবারেই যৎসামান্য। মেশিনের অপ্রতুলতায় ক্যানসার রোগীদের রেডিওথেরাপি নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
বেসরকারি পর্যায়ে যেসব হাসপাতালে রেডিওথেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এ কারণে বেশির ভাগ রোগী মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। সরকারি হাসপাতালের রেডিওথেরাপির চিকিৎসা নিতে রোগীদের ছয় থেকে এক বছরের মতো সময় লেগে যায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার ফলে সংকটাপন্ন হাজারো রোগী ক্রমেই মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘসময়ে চিকিৎসা না পেয়ে যেসব রোগী মৃত্যু পথযাত্রী হচ্ছে, তার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) বলছে, বাংলাদেশে রোগী অনুপাতে কমপক্ষে ১৭০টি রেডিওথেরাপি মেশিন প্রয়োজন। দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১২টি রেডিওথেরাপি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ২টি লিনাক মেশিন আছে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি কোবাল্ট ও একটি ব্র্যাকিথেরাপি মেশিন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি কোবাল্ট, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি কোবাল্ট, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে একটি কোবাল্ট মেশিন আছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি লিনাক মেশিন রয়েছে। এ ছাড়াও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) দুটি লিনাক মেশিন রয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুটি লিনাক অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একটি মেশিন অকেজো অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই রেডিওথেরাপির মেশিন নেই।
বেসরকারিভাবে ঢাকায় আহসানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতাল, ডেল্টা হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতাল, ল্যাব এইড ক্যানসার হাসপাতাল, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল ও সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেডিওথেরাপির ব্যবস্থা আছে।
ঢাকার বাইরে সিরাজগঞ্জ খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বগুড়া টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট নর্থইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রামে মা ও শিশু হাসপাতাল এবং এভারকেয়ার হাসপাতালে এ সেবা চালু আছে। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে শুধু ডেল্টা ও আহসানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতালে কোবাল্ট ও লিনাক মেশিন ব্যবহার হয়। বাকিগুলোতে লিনাক মেশিন রয়েছে।
গত রোববার (১১ জানুয়ারি) জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রেডিওথেরাপির যারা সিরিয়াল দিয়েছিলেন তাদের আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে থেরাপি নেয়ার জন্য আসতে বলা হচ্ছে। এ সময় এক বৃদ্ধকে করুণ কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, এখনিতো আমার মরার অবস্থা, এক বছর পর্যন্ত বাঁচব তো!
হাসপাতালটির পরিচালক, সহকারী পরিচালক এবং রোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেডিওথেরাপির চিকিৎসার জন্য অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছরের মতো অপেক্ষা করতে হয়।
রেডিওথেরাপির সিরিয়ালের জন্য আসা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রাজধানীর মিরপুরে বসবাসকারী এক রোগী জানান, আমি সাত/আট মাস যাবত ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছি। কেমোথেরাপি, তারপর সার্জারি করেছি, এখন রেডিওথেরাপি নিতে হবে। কিন্তু এখানে এক বছরের আগে সিরিয়াল পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না। আবার বেসরকারকারি হাসপাতালে সিরিয়াল পাওয়া গেলেও তার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য আমার নাই।
ক্ষোভ প্রকাশ করে এই রোগী আরও বলেন, সরকার যদি নাগরিকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো চিকিৎসা দিতে নাই পারে, তাহলে সেই সরকার থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।
অপরদিকে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) অনকোলজি বিভাগে যোগাযোগ করে জানা যায়, রোগীর কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর অন্তত চার মাস অপেক্ষা করতে হবে রেডিওথেরাপি দেওয়ার প্রসেসিং শুরু করতে।
রেডিওথেরাপি মেশিনের সংকট ক্যানসার চিকিৎসায় কতটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে জানতে চাইলে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের ক্যানসার রোগতত্ত্ব বিভাগের সাবেক প্রধান এবং গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যানসার হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বাংলানিউজকে বলেন, ক্যানসার চিকিৎসায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাবতীয় ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। সাধারণ গরিব মধ্যবিত্তরা যেন চিকিৎসা পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, রেডিওথেরাপি মেশিন এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনায় কম আছে। যা আছে সেগুলোও বছরের পর বছর নষ্ট কিংবা অকেজো হয়ে থাকে। রোগীদের সিরিয়াল পেতে ছয় মাস এক বছর লাগে। জরায়ুমুখ ক্যানসারের কোনো রোগী যদি তার অপারেশন হয়, অনেক ক্ষেত্রে অপারেশনের স্টেজ পার হয়ে যায়, তখন রেডিওথেরাপি হচ্ছে প্রধান চিকিৎসা। যে রোগীর তাৎক্ষণিক রেডিওথেরাপি দরকার সেই রোগী যদি এক বছর পর সিরিয়াল পান, এমন একশো রোগীকেও যদি এক বছর পর সিরিয়াল দেওয়া হয়, তাহলে সেইসব রোগীর বাঁচার কথা না। এটাতো গণহত্যার শামিল হয়ে গেল। তাহলে একশো রোগীকে আমরা মেরে ফেললাম। রাষ্ট্র তার দায়িত্বে অবহেলা করে একশো রোগীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল। এটাতো একটা গণহত্যা!
রেডিওথেরাপির দীর্ঘ সিরিয়াল প্রসঙ্গে ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, ক্যানসারের মতো একটা ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত একজন রোগীকে এক বছর অপেক্ষা করতে বলা মশকরা ছাড়া আর কিছুই না। কেন তাকে এক বছর অপেক্ষা করতে হবে? কেন মেশিন অকেজো বা বন্ধ হয়ে যায়? ছয়টা মেশিন একসাথে কেন নষ্ট হয়। এই মেশিনের আয়ু কতদিন ছিল? সেটা আমাদের মন্ত্রণালয়ের লোকজন জানতো না? তাহলে এক বছর আগে থেকে কেন ব্যবস্থা নিল না, কেন নতুন মেশিন কিনল না? আবার যখন কিনছে তখন ছয়টার জায়গায় কেন একটা কিনল? একসাথে ১০টা রেডিওথেরাপি মেশিন কিনতে কয় টাকা লাগে? ক্যানসার চিকিৎসার নামে রোগীদের সাথে যা চলছে তা শুধু মশকরা নয়, চরম অপরাধ।
রেডিওথেরাপি সংকট এবং সমাধান প্রসঙ্গে বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেসের সাবেক উপাচার্য এবং স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি কেনা, মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা খুবই অপ্রতুল। সরকারি হাসপাতালে বিনিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কোন মেশিন লাগানোর পর মেইন্টেন্যান্স করা, খারাপ হলে দ্রুত ঠিক করার ব্যবস্থা করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নাই।
তিনি বলেন, বেসরকারি যেসব হাসপাতালে মূল্যবান রেডিওথেরাপি মেশিনগুলো খুব বেশি কাজে লাগছে না, অতি মূল্যের কারণে যেসব বেসরকারি হাসপাতালে বেশি রোগী রেডিওথেরাপির সেবা নিতে পারছে না, সেখান থেকে সরকারের মাধ্যমে স্ট্রাটেজিক পারচেজ করে রোগীদের সেবা দেওয়া যেতে পারে। এটা যদি আবার গরিব মানুষের ওপরে চাপিয়ে দেয় তাহলে কিন্তু হবে না। এখানে সরকারি মেকানিজম থাকতে হবে। একইসাথে সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে হবে।
এই চিকিৎসা বিজ্ঞানী বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের সময় বর্তমান ডিজিজ প্যাটার্ন কী, কোন রোগে মানুষের পকেট থেকে বেশি খরচ হয়— এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেইসব খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।