বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নীতি নির্ধারণী প্রেক্ষাপটে নতুন এক আবহের সৃষ্টি করে প্রথমবারের মতো কোনো আনুষ্ঠানিক সেমিনারে বক্তব্য দিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। রবিবার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে ঢাকা ফোরাম আয়োজিত ‘জাতি গঠনে নারী: নীতি, সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি অংশ নেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত মার্জিত এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে দেশ গঠনের প্রক্রিয়ায় সবার অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের মেলবন্ধন
ব্যারিস্টার জাইমা রহমান তার বক্তব্যে সহনশীলতা ও বহুত্ববাদী সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “আজ আমরা এখানে যারা উপস্থিত হয়েছি, আমাদের প্রত্যেকের আদর্শ, অভিজ্ঞতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু এই ভিন্নতা সত্ত্বেও আমরা একই ছাদের নিচে বসেছি কারণ আমাদের লক্ষ্য এক—দেশের মানুষের উন্নয়ন।” তিনি আরও যোগ করেন যে, ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও একে অপরের কথা শোনার এই সংস্কৃতিই হলো ‘Democracy’ বা গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য। তার মতে, একটি সুস্থ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে এই মেলবন্ধন অত্যন্ত জরুরি।
নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে প্রথম পদক্ষেপ
নিজের ব্যক্তিগত অবস্থানের বিষয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জাইমা রহমান বলেন, “বাংলাদেশের ‘Policy Level’ বা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এটাই আমার প্রথম বক্তব্য। আমি এমন কেউ নই যার কাছে সব সমস্যার জাদুকরী সমাধান আছে। তবে আমি বিশ্বাস করি, নিজের ক্ষুদ্র অবস্থান থেকেও দেশের জন্য ভালো কিছু করার ঐকান্তিক ইচ্ছা আমাদের সবার থাকা উচিত।” তিনি জানান, মূলত নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে এবং সবার সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা নিয়ে তিনি এই প্ল্যাটফর্মে এসেছেন।
নারী উন্নয়ন ও উন্নয়নের মূলধারা
দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারীদের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জাইমা রহমান বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ নারী। এই বৃহৎ অংশকে উন্নয়নের মূলধারার বাইরে রেখে বা একপাশে সরিয়ে রেখে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কেবল একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ: অর্থনৈতিক বাধা ও সম্ভাবনা
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে প্রধান অন্তরায়গুলো চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘Access to Finance’ বা অর্থায়নের সুযোগ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে নানা প্রশাসনিক ও সামাজিক বাধার সম্মুখীন হন। তিনি সতর্ক করে বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ যখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, তখন নারীদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা আরও জরুরি হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা তামারা আবেদ নারীদের প্রথাগত দৃষ্টিতে দেখার পরিবর্তে ‘Human Capital’ বা মানবসম্পদ হিসেবে মূল্যায়নের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নারীদের মধ্যে যে সুপ্ত সম্ভাবনা (Hidden Potentiality) রয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
নেতৃত্বের বার্তা ও আগামীর পথ
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থিতিতে জাইমা রহমানের এই অংশগ্রহণকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। জাইমা মূলত এই সেমিনারের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং ‘Economic Empowerment’ বা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নই হবে আগামী দিনের মূল চালিকাশক্তি। অনুষ্ঠানটি শেষে উপস্থিত সুধীজনের মাঝে জাইমা রহমানের আধুনিক ও সময়োপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।