অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন বলেছেন, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে সরকার ৮৪টি সুনির্দিষ্ট সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। সোমবার (২০ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় নেত্রকোনা জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ‘গণভোট’ (Referendum) এর প্রচারণা উপলক্ষে এই সভার আয়োজন করা হয়।
রাষ্ট্রের মালিকানা ও সংস্কারের রূপরেখা
উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন তার বক্তব্যে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের রাষ্ট্রের মালিকানা আমাদেরই। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে ৮৪টি সংস্কারের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করব যে, এ দেশের মানুষই রাষ্ট্রের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক।” তিনি আরও জানান, বিগত সরকারের সময় যে শাসনতান্ত্রিক ও ব্যবসায়িক ‘দুর্বৃত্তায়ন’ (Criminalization) চলেছে, তা থেকে মুক্তি পেতেই এই সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
পদ্মা সেতুর ঋণের বোঝা ও চালের দাম
সভার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল দেশের অর্থনীতি ও মেগা প্রজেক্ট নিয়ে উপদেষ্টার বিশ্লেষণ। শেখ বশির উদ্দিন দাবি করেন, বড় বড় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার মতো মৌলিক খাতকে অবহেলা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা যদি পদ্মা ব্রিজ (Padma Bridge) না বানিয়ে সেই অর্থ সেচ ব্যবস্থায় (Irrigation) ব্যয় করতাম, তবে দেশে চালের দাম কেজিতে অন্তত পাঁচ টাকা কম থাকতো।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বর্তমানে চালের দাম যে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, তার অন্যতম কারণ পদ্মা সেতুর দেনা পরিশোধ (Debt Repayment)। এই মেগা প্রজেক্টের পেছনে ব্যয় হওয়া বিপুল বৈদেশিক ঋণ আমাদের অর্থনীতির জন্য কোনো টেকসই লাভ বয়ে আনেনি, বরং এটি এখন ‘ফিসকাল বার্ডেন’ বা অর্থনীতির বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও গণভোটের আহ্বান
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুষম ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, “শেখ হাসিনার আমলে সাংবাদিকতা ও ব্যবসায়িক খাতে যে ভয়াবহ অনাচার হয়েছে, তা দূর করে ‘ইনসাফ’ বা ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই আমরা গণভোটের প্রচারণা চালাচ্ছি।” জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন এবং জবাবদিহিমূলক সরকার গঠনের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
নির্বাচনী ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আয়োজিত এই সভায় নেত্রকোনা জেলার ১০টি উপজেলার পাঁচটি আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. রাফিকুজ্জামান গণভোট ও নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।
সভায় নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান এবং পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলামসহ সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সভায় আলোচকরা মনে করেন, মেগা প্রকল্পের ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সঠিক ‘ইকোনমিক পলিসি’ (Economic Policy) গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।