• ব্যবসায়
  • বাম্পার ফলনেও লোকসানের শঙ্কা: হিলির আলুচাষিদের কপালে কেন চিন্তার ভাঁজ?

বাম্পার ফলনেও লোকসানের শঙ্কা: হিলির আলুচাষিদের কপালে কেন চিন্তার ভাঁজ?

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
বাম্পার ফলনেও লোকসানের শঙ্কা: হিলির আলুচাষিদের কপালে কেন চিন্তার ভাঁজ?

হিলির অস্থায়ী হাটে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার আলু কেনাবেচা হলেও ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা; নেপথ্যে কোল্ড স্টোরেজের বাড়তি ভাড়া ও পুরাতন আলুর আধিপত্য।

মাঠভরা সোনালি আলু, মুখে চওড়া হাসি থাকার কথা ছিল কৃষকের। কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো। উত্তরের জনপদ দিনাজপুরের হিলিতে এবার আলুর বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। অনুকূল আবহাওয়া আর হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে ঘরে ফসল উঠলেও, বাজারের বর্তমান ‘মার্কেট ভ্যালু’ (Market Value) চাষিদের কুরে কুরে খাচ্ছে। মূলত কোল্ড স্টোরেজে পুরাতন আলুর অস্বাভাবিক মজুত এবং নতুন আলুর চড়া উৎপাদন খরচের কারণে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

মাধবপাড়ার ঐতিহ্যবাহী হাট: যেখানে মিশে আছে আবেগ ও অর্থনীতি

দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার মাধবপাড়া এলাকায় গত ৩০ বছর ধরে এক অনন্য ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আছে স্থানীয় আলুর হাট। প্রতি বছর আলুর মৌসুমে খট্রামাধবপাড়া ইউনিয়নের এই অস্থায়ী হাটটি বসে মূলত স্থানীয় মসজিদের উন্নয়নের মহৎ উদ্দেশ্যে। প্রতিদিন এই হাটে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার আলু কেনাবেচা হয়। এই হাট থেকে সংগৃহীত ইজারার অর্থ ব্যয় করা হয় এলাকার বিভিন্ন মসজিদের সংস্কার কাজে। কিন্তু এবারের চিত্র কিছুটা ম্লান। হাটে আলুর সরবরাহ প্রচুর থাকলেও ক্রেতাদের মাঝে কাঙ্ক্ষিত উৎসাহ নেই।

উৎপাদন খরচ বনাম বাজার দর: এক অসম লড়াই

চলতি মৌসুমে হিলিতে প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলুর চাষ হয়েছে। কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতি বিঘা জমিতে আলু উৎপাদনে সার, বীজ এবং শ্রমিকের মজুরিসহ ‘প্রোডাকশন কস্ট’ (Production Cost) দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।

অথচ বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে ছোট জাতের আলু প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায়। আর বড় জাতের আলুর দাম আরও হতাশাজনক; প্রতি মণ মাত্র ১০০০ থেকে ১০৫০ টাকা। কৃষকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এই দাম অনেকটাই কম। ফলে বিঘাপ্রতি লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা।

কেন এই দরপতন? ‘সাপ্লাই চেইন’ ও কোল্ড স্টোরেজের প্রভাব

বাজার বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, আলুর এই দরপতনের পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে:

১. পুরাতন আলুর আধিপত্য: দেশের বিভিন্ন কোল্ড স্টোরেজে (Cold Storage) এখনও বিপুল পরিমাণ পুরাতন আলু মজুত রয়েছে। বাজারে নতুন আলুর পাশাপাশি পুরাতন আলুর সরবরাহ সস্তা হওয়ায় নতুন আলুর চাহিদা ও দাম—উভয়ই কমে গেছে।

২. কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া: নতুন আলু সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজের ভাড়া এবার তুলনামূলক বেশি। ফলে চাষিরা আলু গুদামজাত না করে সরাসরি বাজারে ছেড়ে দিচ্ছেন, যা ‘সাপ্লাই চেইন’ (Supply Chain)-এ অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং দাম কমিয়ে দিচ্ছে।

কৃষি বিভাগের আশার বাণী ও রফতানি সম্ভাবনা

যদিও কৃষকরা লোকসানের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন, তবে সরকারি কর্মকর্তারা এখনও ইতিবাচক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন। হাকিমপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মোছা. আরজেনা বেগম জানান, আগাম জাতের আলু চাষে সময় কম লাগে এবং এটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী। কৃষি বিভাগ থেকে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে বাজারে যে দরপতন দেখা যাচ্ছে, তা সাময়িক। যদি দ্রুত আলুর ‘এক্সপোর্ট’ (Export) বা রফতানি প্রক্রিয়া শুরু করা যায়, তবে কৃষকরা তাদের ন্যায্য মূল্য ফিরে পাবেন এবং লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, রফতানির জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে আলু সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হবে।

হিলির এই প্রান্তিক চাষিদের সংকট নিরসনে দ্রুত বাজার মনিটরিং এবং ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, আগামীতে আলু চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন এই অঞ্চলের কৃষকরা।

Tags: agriculture crisis supply chain market value potato farming hili news cold storage production cost farmer loss export potential dinajpur agriculture