ঢাকা শহরের নাগরিকদের জীবনের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো বাড়িভাড়া। সরকারি কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় বাড়ির মালিকরা প্রায়শই ইচ্ছামতো ভাড়া বৃদ্ধি করেন, যার ফলে দুর্ভোগে পড়েন ভাড়াটিয়ারা। এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের অধিকার সুরক্ষায় 'বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১' অনুযায়ী একটি নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এই নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য হলো একটি মানসম্মত ও ন্যায্য ভাড়া পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা এবং উভয় পক্ষের জন্য স্পষ্ট নিয়মকানুন তৈরি করা।
বাড়ির মালিকের আবশ্যিক কর্তব্য
১. বাড়ির মালিকের প্রধান দায়িত্ব হলো তাঁর বাড়িটি অবশ্যই বসবাসের উপযোগী করে রাখা। ২. বাড়িতে ইউটিলিটি সার্ভিসেস (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি) এর নিরবচ্ছিন্ন কানেকশন, দৈনিক গৃহস্থালি বর্জ্য কালেকশনসহ অন্যান্য সব সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সমস্যা হলে বাড়িওয়ালা দ্রুত তা সমাধান করবেন। ৩. বাড়ির সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কোনো পদক্ষেপ নিলে তা ভাড়াটিয়াকে জানাতে হবে এবং বাস্তবায়নের আগে তাঁর মতামত নিতে হবে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে যুক্তিযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। ৪. নিরাপত্তার স্বার্থে, বাড়িওয়ালা তাঁর প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকে ছাদ ও মূল গেটের চাবি শর্তসাপেক্ষে প্রদান করবেন।
ভাড়া প্রদান ও রসিদ সম্পর্কিত নিয়ম
১. ভাড়াটিয়াকে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাড়িওয়ালাকে ভাড়া প্রদান করতে হবে। ২. বাড়ির মালিককে অবশ্যই প্রতি মাসে মাসিক ভাড়ার লিখিত রসিদ প্রমাণ কপি হিসেবে ভাড়াটিয়াকে দিতে হবে এবং ভাড়াটিয়াও স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত রসিদ সংগ্রহ করবেন। ৩. বাড়িভাড়া নেওয়ার সময় ১ থেকে ৩ মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না।
ভাড়া বৃদ্ধি ও চুক্তি বাতিলের শর্ত
১. মানসম্মত ভাড়া কার্যকরী হওয়ার তারিখ থেকে দুই বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এই সময়ের আগে কোনো অবস্থাতেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না। ২. দুই বছর পর দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ভাড়ার পরিবর্তন করা যেতে পারে। ভাড়া বৃদ্ধির সময় হবে জুন-জুলাই। ৩. মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণের বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়িভাড়ার বাজারমূল্যের শতকরা ১৫ ভাগের বেশি হবে না। ৪. আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে, ভাড়া চুক্তি বাতিল করতে চাইলে দুই মাসের নোটিশ দিয়ে উভয় পক্ষই তা করতে পারবে। ৫. নির্দিষ্ট সময় ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে বাড়িওয়ালা প্রথমে মৌখিকভাবে সতর্ক করবেন। তাতে কাজ না হলে সমস্ত বকেয়া প্রদান করে ২ মাসের মধ্যে বাড়ি ছাড়ার জন্য লিখিত সতর্কতামূলক নোটিশ প্রদান করে চুক্তি বাতিল করা যাবে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
১. বাড়িতে ভাড়াটিয়ার যে কোনো সময়ে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকবে। ২. বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া (বাড়িওয়ালার পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে) বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং বাড়ির সামনের উন্মুক্ত স্থানে সবুজায়ন (ফুল/ফল/সবজি) করতে পারবেন। ৩. লিখিত চুক্তিতে ভাড়া দেওয়া, ভাড়া বাড়ানো, অগ্রিম জমা ও কখন বাড়ি ছাড়বেন— এসব শর্ত অবশ্যই সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। ৪. সিটি করপোরেশন এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি এবং ভাড়াটিয়াদের সমিতি গঠন করতে হবে। এই সমিতিগুলোর প্রতিনিধিরা স্থানীয় ওয়ার্ড পর্যায়ে ভাড়াসংক্রান্ত বিবাদের সালিশে থাকবেন। ৫. যেকোনো সমস্যা প্রথমে ওয়ার্ড/ জোনভিত্তিক সমিতিগুলোর আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। এতে সমাধান না হলে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর জানাতে হবে। ৬. ডিএনসিসি প্রদত্ত এই নির্দেশিকা ভাড়াটিয়া এবং বাড়িওয়ালাদের মেনে চলার জন্য সচেতন করা হবে এবং জটিলতা সৃষ্টি হলে জোনভিত্তিক মতবিনিময় ও আলোচনাসভার আয়োজন করা হবে।