• ব্যবসায়
  • রমজানের আগেই কি কাটবে এলপিজি সংকট? আমদানিকারকদের আশ্বাস বনাম বাজারের চরম ‘সিলিন্ডার নৈরাজ্য’

রমজানের আগেই কি কাটবে এলপিজি সংকট? আমদানিকারকদের আশ্বাস বনাম বাজারের চরম ‘সিলিন্ডার নৈরাজ্য’

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
রমজানের আগেই কি কাটবে এলপিজি সংকট? আমদানিকারকদের আশ্বাস বনাম বাজারের চরম ‘সিলিন্ডার নৈরাজ্য’

সিলিন্ডার প্রতি বাড়তি গুনতে হচ্ছে ১৭০০ টাকা পর্যন্ত; সাধারণ গ্রাহকের পকেট থেকে লুট হচ্ছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি উপদেষ্টার সঙ্গে আমদানিকারকদের জরুরি বৈঠক।

পবিত্র রমজান মাস দোরগোড়ায়। ঠিক এমন সময়ে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের অবিচ্ছেদ্য অংশ এলপিজি (LPG) গ্যাস নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম অস্থিরতা। একদিকে বাজারে তীব্র সংকট, অন্যদিকে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রি—সব মিলিয়ে দিশেহারা সাধারণ ভোক্তা। তবে এই সংকটের মেঘ কেটে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন গ্যাস আমদানিকারকরা। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টার সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, রমজান শুরুর আগেই বাজারে এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

আমদানিকারকদের আশ্বাস ও সরবরাহ পরিস্থিতি

জ্বালানি উপদেষ্টার সঙ্গে অনুষ্ঠিত এই জরুরি বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় এলপিজি আমদানিকারকরা বর্তমান সংকটের কারণ ও তা উত্তরণের পথ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তারা জানান, ডলার সংকটের কারণে এলসি (LC) খোলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের উত্থান-পতনের ফলে সাপ্লাই চেইন (Supply Chain) কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছিল। তবে বর্তমানে আমদানির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হয়েছে এবং রমজানে চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার কাজ চলছে। আমদানিকারকদের দাবি, নতুন চালান বাজারে আসা শুরু করলেই ‘আর্টিফিশিয়াল ক্রাইসিস’ বা কৃত্রিম সংকটের অবসান ঘটবে।

বাজারের ‘সিলিন্ডার নৈরাজ্য’ ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি

সরকার ও আমদানিকারকদের আশ্বাসের মাঝেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভয়াবহ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দামকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে খুচরা বিক্রেতারা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করছেন। যা নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা বড় সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে; ৩৫ কেজি সিলিন্ডারের জন্য গ্রাহককে বাড়তি গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৭০০ টাকা।

নিম্ন আয়ের ও সীমিত বেতনের মানুষের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে একজন সাধারণ ক্রেতা বলেন, “আগে যে গ্যাস ১২০০-১৩০০ টাকায় কিনতাম, এখন তা ২২০০ টাকা। অথচ আমাদের আয় বাড়েনি। বাজারে কোনো মনিটরিং নেই, যে যার ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে পকেট কাটছে।”

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও রেস্তোরাঁ খাত

এলপিজি গ্যাসের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতেও। জ্বালানি ব্যয় দ্বিগুণ হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী পুঁজি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। রাজধানীর হাতিরপুলের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী মো. সেলিমের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিক্ত। তিনি জানান, মাত্র ১০ দিনে এলপিজি গ্যাসের পেছনে তার বাড়তি খরচ হয়েছে ৯ হাজার টাকা। ছোট তিনটি সিলিন্ডারে ৩ হাজার এবং বড় সিলিন্ডারে ৬ হাজার টাকা বেশি দিতে হয়েছে তাকে। খাবারের দাম বাড়াতে না পারায় এখন পুরো ব্যবসা লোকসানের মুখে।

লুট হচ্ছে আড়াই হাজার কোটি টাকা

এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি গ্যাস সিলিন্ডার রয়েছে। এর মধ্যে প্রতি মাসে সোয়া কোটি সিলিন্ডার রিফিল করা হয়। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি সিলিন্ডারে যদি গড়ে ১ হাজার টাকাও বাড়তি নেওয়া হয়, তবে প্রতি মাসে সাধারণ গ্রাহকের পকেট থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি অসাধু চক্র। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লুণ্ঠনের ফলে বাজারের ‘Market Value’ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে।

প্রশাসনের তৎপরতা ও প্রত্যাশা

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাজার মনিটরিংয়ের দাবি করলেও বাস্তবে তার সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ সাধারণ মানুষের। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র আমদানিকারকদের আশ্বাসে বসে না থেকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও নিয়মিত বাজার তদারকি নিশ্চিত করতে না পারলে আসন্ন রমজানে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করতে পারে।

এখন দেখার বিষয়, আমদানিকারকদের দেওয়া এই আশ্বাস আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।

Tags: price hike supply chain bangladesh energy fuel price consumer rights lpg crisis market syndicate ramadan gas energy adviser cylinder anarchy