পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ডাকাতি ও চুরির আতঙ্ক থেকে বাঁচতে এক অভাবনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীপথকে অপরাধীদের ‘Safe Passage’ হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে তারা সরাসরি নদীর মাঝপথেই তুলে দিয়েছেন বাঁশের বেড়া। গুমানি নদীর বুক চিরে তৈরি করা এই ‘Bamboo Barricade’ এখন এলাকার নিরাপত্তার প্রধান রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নদী যখন অপরাধীদের ‘এস্কেপ রুট’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি পাবনার ভাঙ্গুড়া ও চতুষ্পার্শ্বস্থ এলাকায় নৌ-পথে অপরাধীদের আনাগোনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে উপজেলার অষ্টমণিষা বাজারে সম্প্রতি একটি স্বর্ণের দোকানে বড় ধরনের ডাকাতি এবং বেশ কয়েকটি গরু চুরির ঘটনা এলাকায় তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অপরাধীরা মূলত ইঞ্জিনচালিত নৌকা (Engine-driven Boat) ব্যবহার করে রাতের অন্ধকারে গ্রামে হানা দেয় এবং কাজ শেষে দ্রুত নদীপথে পালিয়ে যায়। পুলিশের নজরদারি এড়িয়ে নৌ-পথকে অপরাধীদের ‘Escape Route’ হিসেবে ব্যবহার করা ঠেকাতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন বেতুয়ান গ্রামের মানুষ।
স্বেচ্ছাশ্রমে তিন দিনের কর্মযজ্ঞ
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সরেজমিনে দেখা যায়, বেতুয়ান গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া গুমানি নদীর মাঝ বরাবর খুঁটি পুঁতে শক্ত বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়েছে। গ্রামের বাসিন্দা সজীব হোসেন জানান, এই কাজ কোনো ঠিকাদার বা সরকারি অনুদানে হয়নি। গত তিন দিন ধরে গ্রামের সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের (Voluntary Labor) ভিত্তিতে এই বেড়া তৈরির কাজ সম্পন্ন করেছেন। সোমবার সন্ধ্যা নাগাদ কাজ শেষ হলে পুরো এলাকাটিতে একটি অলিখিত ‘Security Measures’ বা নিরাপত্তার চাদর তৈরি হয়।
আব্দুল মজিদ নামের এক গ্রামবাসী ক্ষোভের সাথে বলেন, “চোর-ডাকাতরা নদীপথে এসে আমাদের সহায়-সম্বল লুট করে নিয়ে যায়। তারা ভাটির দিকে নৌকা নিয়ে পালিয়ে গেলে আর ধরা ছোঁয়ার মধ্যে থাকে না। আমাদের নিজেদের জানমাল রক্ষার জন্যই এই উদ্যোগ নিতে হয়েছে।”
ভারসাম্য রক্ষায় বিকল্প পথ ও তদারকি
নদীতে পুরোপুরি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলে সাধারণ নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে গ্রামবাসী বেড়ার একটি নির্দিষ্ট অংশে নৌ চলাচলের জন্য ছোট একটি ‘Navigational Path’ বা গলি রেখেছেন। তবে এই পথটিও সার্বক্ষণিক নজরদারির (Surveillance) আওতায় রাখা হয়েছে। দিনের বেলা সাধারণ নৌকা চলাচল করতে পারলেও সূর্যাস্তের পর এই পথ দিয়ে কোনো অপরিচিত বা সন্দেহজনক নৌযান যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে পাহারাদার নিয়োগ করা হয়েছে।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য
ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নৌ-পথে গরু চুরি ও ডাকাতির ক্রমবর্ধমান ঘটনার কারণে গ্রামবাসীর মধ্যে এক ধরণের ‘Mass Anxiety’ বা গণ-আতঙ্ক কাজ করছিল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি গ্রামবাসীর এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে পুলিশ। তবে দিনে যাতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে কোনো ভোগান্তি না হয়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন।
ডিজিটাল যুগে যেখানে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়, সেখানে নিজেদের অস্তিত্ব ও সম্পদ রক্ষায় পাবনার এই প্রান্তিক মানুষের ‘Physical Barrier’ তৈরির ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। একে ‘Community Policing’-এর একটি অনন্য ও লোকজ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সমাজ বিশ্লেষকরা।