নাটোর: একই জেলার মাটি, একই জলবায়ু, অথচ উত্তরবঙ্গের চিনিশিল্পের দুই প্রধান প্রতিষ্ঠানের চিত্র এখন সম্পূর্ণ বিপরীত। দীর্ঘ দুই দশকের লোকসানের গ্লানি মুছে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে গোপালপুরের ঐতিহাসিক নর্থ বেঙ্গল চিনিকল। কিন্তু ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে নাটোর চিনিকল। আখের দাম বাড়ার সুফল কাজে লাগিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, অন্যটি তখন ডুবছে অব্যবস্থাপনা আর কৃষকদের আস্থার সংকটে।
লাভের কক্ষপথে উত্তরবঙ্গের প্রাচীনতম চিনি কল
১৯৩৩ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত নর্থ বেঙ্গল চিনিকলটি দেশের অন্যতম প্রাচীন শিল্প প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ ২০ বছরের লোকসান কাটিয়ে গত দুই মাড়াই মৌসুমে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০ কোটি টাকা নিট মুনাফা (Net Profit) অর্জন করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে আখের দাম বাড়ানোর সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এই সাফল্যে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
চিনিকলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ হোসেন ভূঁইয়া জানান, বর্তমানে এই মিলে দৈনিক ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “চিনিকলটির আধুনিকায়ন বা Modernization এখন সময়ের দাবি। এটি করা গেলে মাড়াই সক্ষমতা ২ হাজার ৫০০ টানে উন্নীত হবে, যা Production Cost কমিয়ে Profit Margin আরও বাড়াতে সাহায্য করবে।” চলতি মৌসুমে ২ লাখ মেট্রিক টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
লোকসানের চোরাবালিতে নাটোর চিনিকল: ব্যবধান কোথায়?
সাফল্যের এই উজ্জ্বল চিত্রের পাশেই ধূসর হয়ে আছে নাটোর চিনিকল। গত দুই মৌসুমে নর্থ বেঙ্গল চিনিকল যখন লাভের মুখ দেখেছে, নাটোর চিনিকল তখন প্রায় ২৫ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নর্থ বেঙ্গল চিনিকল কর্তৃপক্ষ তাদের জোনে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে আখের আবাদ নিশ্চিত করতে পারলেও নাটোর চিনিকল এলাকায় তা মাত্র ৮ হাজার হেক্টরে সীমাবদ্ধ।
এই চরম ব্যর্থতার বিষয়ে নাটোর চিনিকলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও, মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মূলত কৃষকদের অনীহা এবং মিল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাই এই সংকটের মূলে।
চাষিদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও ‘পুর্জি’ সিন্ডিকেট
নাটোর চিনিকলের লোকসানের পেছনে কৃষকদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ একটি বড় কারণ। সদর উপজেলার তেলকূপি এলাকার কৃষক রাশেদ জানান, নর্থ বেঙ্গল চিনিকল নাটোর চিনিকলের তুলনায় অন্তত তিন সপ্তাহ আগে মাড়াই কার্যক্রম শুরু করে। এর ফলে সেখানকার চাষিরা দ্রুত জমি খালি করে রবিশস্য বা ‘চৈতালী’ ফসল চাষের সুযোগ পান।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, আখ বিক্রির অনুমতিপত্র বা ‘পুর্জি’ বিতরণে এখানে চরম বৈষম্য করা হয়। প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক মদতপুষ্ট চাষিরা দ্রুত পুর্জি পেলেও সাধারণ ও প্রান্তিক কৃষকদের দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। সময়মতো আখ কাটতে না পারায় তারা পরবর্তী ফসলের আবাদ করতে পারেন না, যা তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক চাষিই আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: আধুনিকায়ন ও বহুমুখীকরণ
দেশের চিনিশিল্পের এই টালমাটাল অবস্থায় সরকার নতুন করে সংস্কারের পরিকল্পনা করছে। শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান জানিয়েছেন, চিনিকলগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও লাভজনক করতে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
উপদেষ্টা বলেন, “ভবিষ্যৎ বাজার মোকাবিলায় শুধু চিনি উৎপাদন করে টিকে থাকা কঠিন। তাই আমরা Industrial Diversification বা উপজাত পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা নিচ্ছি। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় এবং Private Investment বা বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মাধ্যমে এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নাটোর চিনিকলকে বাঁচাতে হলে কেবল আখের দাম বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং মাড়াই মৌসুম এগিয়ে আনা এবং ‘পুর্জি’ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নর্থ বেঙ্গলের মডেল অনুসরণ করে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি দূর করতে পারলে নাটোর চিনিকলও আবার লাভের মুখ দেখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।