আন্তর্জাতিক সংগঠনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
গ্রিনল্যান্ডের ওপর আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশ্যে আগ্রহ দেখানো এবং কার্যত তা দখলের পথে হাঁটা আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের নৈতিক দেউলিয়াত্বের এক স্পষ্ট উদাহরণ। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই দখলদারিত্বের লক্ষ্য ন্যাটোর ঘনিষ্ঠ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত একটি দেশ। এর ফলে প্রশ্ন উঠছে, ন্যাটো জোটের প্রয়োজনীয়তা কোথায়, যখন জোটের ভেতরেই এমন দখলদার মানসিকতা বৈধতা পেতে পারে।
একইভাবে, ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্র পরিচালকের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সুবিধামতো 'বৈধ' ও 'অবৈধ' সরকার নির্ধারণ করে দেওয়ায় জাতিসঙ্ঘের নীতিও কার্যকারিতা হারাচ্ছে। যদি কোনো দেশের ওপর আক্রমণ হলে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো কেবল বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে, তবে তাদের বাস্তব ভূমিকা কী থাকে?
গণতন্ত্রের মুখোশ ও আইনের শাসনের সংকট
গণতন্ত্রের কথা মুখে বলা হলেও বাস্তবে যখন স্বৈরতন্ত্র, দমননীতি ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দিয়ে দেশ পরিচালিত হয়, তখন 'গণতন্ত্র' শব্দটি অর্থহীন স্লোগানে পরিণত হয়। শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন গণমাধ্যম ও ক্ষমতার জবাবদিহি।
আইন থাকলেও যদি তা প্রয়োগ না হয়, গণমাধ্যম সত্য প্রকাশ করতে না পারে, কিংবা মতপ্রকাশের অধিকার থাকলেও মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, তখন এসব কাঠামো কাগুজে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। যেমন, বারবার ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেলে মানুষ যেমন সেই ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়, তেমনি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও একইরকম বিশ্বাসের ভাঙন স্পষ্ট।
নৈতিক নিরপেক্ষতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
বৈশ্বিক ব্যবস্থার এই সংকট শুধু কার্যকারিতার ব্যর্থতা নয়, এটি বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু ন্যায়ের নিশ্চয়তা নেই। নিয়ম আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য জরুরি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
- নৈতিক নিরপেক্ষতা: আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য এক নিয়ম আর দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য আরেক নিয়ম—এই দ্বৈত মানদণ্ড পরিহার করে নিয়মের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
- গণতন্ত্রকে হাতিয়ার না করা: গণতন্ত্রকে ভূরাজনৈতিক আনুগত্য যাচাইয়ের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে, একে মানুষের অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।
- গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রীয় ও করপোরেট প্রভাবমুক্ত করে সত্যের বাহক হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
- কাঠামোগত সংস্কার: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক কাঠামো আজ পুরোনো। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আইনকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই আন্তর্জাতিক নীতিমালাগুলোকে সময় ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনরায় যাচাই ও সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি।
যেখানে প্রশ্ন থেমে যায়, সেখানে নিয়ম নয়, শক্তিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়। তাই অন্যায়ের সামনে নীরবতা বর্জন করা এবং দ্বিমুখী নীতি ও নৈতিক সুবিধাবাদ পরিত্যাগ করা অপরিহার্য।