• মতামত
  • এআই ও ডিপফেকের বিষাক্ত ছোবল: নির্বাচনকে টার্গেট করে অপতথ্যের সুনামি, মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসনও

এআই ও ডিপফেকের বিষাক্ত ছোবল: নির্বাচনকে টার্গেট করে অপতথ্যের সুনামি, মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসনও

মতামত ১ মিনিট পড়া
এআই ও ডিপফেকের বিষাক্ত ছোবল: নির্বাচনকে টার্গেট করে অপতথ্যের সুনামি, মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসনও

ভুয়াকে সত্য আর দিনকে রাত বানিয়ে ফেলার ম্যাজিক মেশিন—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এখন সাইবার গজব। সিইসি ও প্রধান উপদেষ্টার উদ্বেগ সত্ত্বেও থামানো যাচ্ছে না গুজব ও বিভ্রান্তির স্রোত; আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে সরকার।

গুজব, মিথ্যাকে সত্য, সত্যকে মিথ্যা, এমনকি দিনকে রাত বানিয়ে ফেলার 'ম্যাজিক মেশিন' কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা AI) স্বাভাবিক যাপিত জীবনকেই বিষাক্ত করে তুলেছে। যারা এর ছোবলের শিকার হয়েছেন, তারাই উপলব্ধি করছেন এই বিষের তীব্র যন্ত্রণা। এবারের ভোট এই যন্ত্রণার ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে—এমন শঙ্কা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) আরও আগেই প্রকাশ করেছিলেন। স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টাও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাস্তবে এখন তা শঙ্কা-উদ্বেগের চেয়েও আরও মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

মাঠের ভয়ংকর চিত্র: AI-এর লাগামহীন অপব্যবহার

মাঠের চিত্র এখন ভয়ংকর। যে যা পারছে, করছে। মহলবিশেষ এখন AI ব্যবহার করে যেকোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করে মনগড়া বিষয়বস্তু তৈরি করে ছেড়ে দিচ্ছে এবং তাতে বাধা দেওয়া যাচ্ছে না। মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, গোলমাল বাধছে; আর এর মাধ্যমে মহলবিশেষের উদ্দেশ্যসাধন হচ্ছে। দেশ, সরকার, নির্বাচন কমিশন (EC), প্রার্থী, ভোটার সর্বোপরি জনগণ সবাই এই সাইবার গজবের শিকার। ভোটের দিন পর্যন্ত তা কোথায় গড়াবে, তা ধারণা করতেও শিউরে উঠছেন সচেতন মানুষজন।

ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি মোকাবিলায় সরকার জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা চেয়েছে। এ ছাড়া ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও গুজব প্রতিরোধে আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (National Cyber Security Agency - NCSA)।

এনসিএসএ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় করছে। নির্বাচনে ভুয়া তথ্য ও গুজব ঠেকাতে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID) সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোর সাইবার সিকিউরিটি বিভাগকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও তৎপর থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এত চেষ্টার পরেও অপতথ্য ও গুজবের স্রোত থামানো যাচ্ছে না।

ডিপফেক ও অপতথ্যের বাড়বাড়ন্ত

ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার-এর পরিসংখ্যান বলছে, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, গুজব ও ডিপফেক ভিডিওতে সয়লাব হচ্ছে অনলাইন। শুধু গত ডিসেম্বরেই প্রতিষ্ঠানটি ৪৪৬টি রাজনৈতিক ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। একসময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) ছিল দূর ভবিষ্যতের কাল্পনিক বিষয়। এখন তা দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

এআই এমন একটি পদ্ধতি, যা মানুষের মতো অথবা মানুষের থেকেও বেশি অ্যাডভান্সড (Advanced) চিন্তা-ভাবনা করতে সক্ষম। দ্রুত ডাটা অ্যানালাইসিস করে উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ডাটা প্রসেসিং করাই এর মূল কাজ। মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হওয়ার কারণেই এর অপব্যবহারকারীরা নির্বাচন সামনে রেখে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য বা ফেক নিউজ তৈরি করা তাদের কাছে বেশ সহজ।

ডিপফেক (Deepfake) ভিডিও বা ছবি তৈরির মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্যে ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং সামাজিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য দ্রুত স্পষ্ট নীতিমালা এবং আইন তৈরি করা জরুরি, যাতে এর অপব্যবহার প্রতিরোধ করা যায়।

অপপ্রচারের কৌশল ও আক্রান্ত মহল

ডিজিটাল সাক্ষরতার করুণ অবস্থার কারণে বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন, প্রার্থী, দল, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী যেকোনো কিছু নিয়ে মন্দ কিছু ছড়ালে তা রোখা কঠিন। এখন এআই দিয়ে এমনভাবে ভুয়া ভিডিও, অডিও এবং ছবি তৈরি করা যাচ্ছে, যা একেবারে আসলের মতো মনে হয়। এই প্রযুক্তিনির্ভর বিভ্রান্তি ছাড়াও ব্যবহৃত হচ্ছে 'চিপফেক'-এর মতো কৌশল। এর মধ্যে রয়েছে:

সত্য ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে বিভ্রান্তিকর ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া।

সত্য বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে বা প্রসঙ্গ বদলে ভিন্ন অর্থ তৈরি করা।

সম্পূর্ণ মনগড়া বক্তব্য বা উদ্ধৃতি নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে চালিয়ে দেওয়া।

পুরনো ছবি, ভিডিও বা খবরকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর মাত্রা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। বিভিন্ন দলের শীর্ষ ও আলোচিত নেতা-নেত্রীরা ভুগতে শুরু করেছেন। গণমাধ্যমের ফটোকার্ড, টিভি স্ক্রল বা নিউজ পোর্টাল-এর ডিজাইনের আদলে ভুয়া গ্রাফিকস বানানোর ধুম পড়েছে। মনগড়া তথ্য, সংখ্যা, পরিসংখ্যান, স্ক্রিনশট দিলেই মানুষের নজর কাড়ছে।

অপতথ্য ছড়ানোর সঙ্গে মোটাদাগে দুই শ্রেণির মানুষ জড়িত। এক শ্রেণি রাজনৈতিক অথবা আদর্শিকভাবে উৎসাহিত। অন্য শ্রেণিটি টাকার বিনিময়ে কাজটি করে। অপতথ্যের গতি বেশি এবং এটি সত্য তথ্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায়, ফলে অনেকে তা বেশি বিশ্বাসও করে। এমনকি রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজবকে ভিত্তি ধরে বক্তব্য দিচ্ছেন।

মূল ধারার কিছু সংবাদমাধ্যমও কখনো কখনো এসব ভুয়া খবরকে আমলে নিয়ে প্রকাশ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো সমাজে যখন খবর আর গুজব এক হয়ে যায়, তখন সেখানে প্রথমে মার খায় সাংবাদিকতার নীতি এবং নৈতিক সাংবাদিকতা। এআই দিয়ে তৈরি সংবাদ প্রডাক্ট আর ফেইক ফটোকার্ডের এই বিষাক্ত মহামারি সমাজে যে অস্থিরতা তৈরি করে চলছে, তা নির্বাচনের সৌন্দর্য নষ্ট করছে এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমকেও এক বাজে সন্ধিক্ষণে এনে দিয়েছে।

Tags: election ai fake news btrc cyber security deepfake propaganda misinformation nesa digital threat