ঢাকা মহানগর পুলিশের (DMP) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনি জালে নতুন মোড়। পাহাড়সম অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এই দাপুটে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারসহ দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন আদালত। একইসঙ্গে তাদের নামে থাকা রাজকীয় সব ফ্ল্যাট, প্লট এবং বিঘার পর বিঘা জমি জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) দুর্নীতি দমন কমিশনের (ACC) দুটি পৃথক আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এই যুগান্তকারী আদেশ দেন। আদালতের এই নির্দেশের ফলে আপাতত আছাদুজ্জামান মিয়া ও তার পরিবারের বিপুল ভূসম্পত্তি হস্তান্তর বা বিক্রির কোনো সুযোগ থাকছে না।
যাদের ওপর আইনি খড়্গ
আদালতের দেওয়া দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন আছাদুজ্জামান মিয়ার স্ত্রী আফরোজা জামান, দুই ছেলে আসিফ শাহাদাৎ ও আসিফ মাহদিন এবং মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা। শুধু পরিবার নয়, তার আত্মীয়দের নামে থাকা বেনামি সম্পদের সন্ধানেও মাঠে নেমেছে দুদক। এরই মধ্যে তার দুই শ্যালিকা পারভীন সুলতানা ও ফাতেমাতুজ্জোহরা এবং শ্যালক হারিচুর রহমানের সম্পদও জব্দের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
২২ কোটির সম্পদের পাহাড়: যেখানে যা আছে
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আছাদুজ্জামান মিয়ার সম্পদের এক অবিশ্বাস্য ‘Real Estate’ সাম্রাজ্য। নথিপত্র অনুযায়ী, জব্দকৃত স্থাবর সম্পদের সরকারিভাবে প্রদর্শিত মূল্য ২২ কোটি ৬৫ লাখ ৫২ হাজার ৩৩০ টাকা। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বাজারমূল্যে (Market Value) এই সম্পত্তির দাম কয়েকগুণ বেশি হবে।
জব্দকৃত উল্লেখযোগ্য সম্পদগুলো হলো:
গুলশানের জোয়ার সাহারায় ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ৬ তলা আলিশান আবাসিক ভবন।
ধানমন্ডি ও গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় সুপরিসর ফ্ল্যাট।
রাজধানীর পূর্বাচল ও আফতাব নগরে মূল্যবান প্লট ও জমি।
ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ফরিদপুরের বিভিন্ন মৌজায় মোট ১৪.৩০ একর জমি।
দুদকের অনুসন্ধান ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
দুদক তাদের আবেদনে উল্লেখ করেছে, সাবেক এই পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। একটি উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান টিম (Investigation Team) বর্তমানে এই অভিযোগের গভীর তদন্ত করছে। সংস্থাটির আশঙ্কা ছিল, অভিযুক্তরা তাদের এই অবৈধ সম্পদ দ্রুত অন্যত্র হস্তান্তর বা বেহাত করে দিতে পারেন। রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি এড়াতে এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এই সম্পদগুলো অবিলম্বে জব্দ করা জরুরি ছিল। আদালত দুদকের সেই যুক্তি আমলে নিয়ে এই আদেশ দেন।
পতনের শুরু ও গণমাধ্যমের ভূমিকা
আছাদুজ্জামান মিয়ার এই বিশাল বিত্ত-বৈভবের কথা প্রথম সাধারণ মানুষের সামনে আসে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে। ২০২৪ সালের জুনে ‘মিয়া সাহেবের যত সম্পদ’ শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়। এরপর দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্রগুলোতে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে শত শত শতক জমির তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে।
উল্লেখ্য, আছাদুজ্জামান মিয়া ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দাপটের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তাকে জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় তৎকালীন সরকার। ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর মহাখালী ফ্লাইওভার এলাকা থেকে র্যাব (RAB) তাকে আটক করে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রভাবশালী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতের এই কড়া পদক্ষেপ দেশে ‘Accountability’ বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী বার্তা।