ইরাকের টালমাটাল রাজনীতিতে আবারও চালকের আসনে ফিরছেন নূরী আল-মালিকি। গত শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দেশটির পার্লামেন্টের প্রভাবশালী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া জোট ‘কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ (Coordination Framework) পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক এই তুখোড় রাজনীতিবিদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। এই সমর্থনের ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোন পথে যায়, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন বিশ্লেষণ।
‘কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক’-এর ঘোষণা ও কৌশলগত গুরুত্ব
সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে নিবিড় মিত্রতা থাকা শিয়া দলগুলোর সম্মিলিত জোট ‘কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ সর্বসম্মতিক্রমে নূরী আল-মালিকিকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য মনোনীত করেছে। জোটের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরাকের বর্তমান অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) ভারসাম্য বজায় রাখতে মালিকির দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতাকে (Administrative Expertise) প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সংসদে এই জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় কারিগরিভাবে মালিকির প্রধানমন্ত্রিত্ব এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ইরাকের ক্ষমতার সমীকরণ ও নূরী আল-মালিকির ব্যাকগ্রাউন্ড
৭৫ বছর বয়সি নূরী আল-মালিকি ইরাকের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত চরিত্র। ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর তিনি ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইরাকের সাংবিধানিক প্রথা বা 'পাওয়ার শেয়ারিং' (Power-sharing) মডেল অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী পদটি শিয়াদের জন্য, স্পিকার পদটি সুন্নিদের জন্য এবং রাষ্ট্রপতির আলঙ্কারিক পদটি কুর্দি সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত থাকে।
দীর্ঘদিন পর্দার আড়ালে থাকলেও গত নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের পর মালিকির দল আবারও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন তিনি। তবে এই পরিবর্তন কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং এটি ইরাকের অভ্যন্তরীণ শিয়া মেরুকরণকে আরও সংহত করার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
চড়াই-উতরাই ও বিতর্কের খেরোখাতা
মালিকির প্রত্যাবর্তন যতটা চমকপ্রদ, তাঁর অতীত ততটাই কণ্টকাকীর্ণ। তাঁর পূর্ববর্তী শাসনকালে ইরাকে উগ্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা (Sectarian Violence) চরম আকার ধারণ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সুন্নি সংখ্যালঘুদের প্রান্তিকীকরণ এবং সামরিক বাহিনীতে অদক্ষতা তাঁর শাসনামলের অন্যতম নেতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত। সমালোচকদের মতে, তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দিকে ইরাকের বিশাল এলাকা জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস (ISIS)-এর দখলে চলে যাওয়া ছিল তাঁর সরকারের একটি বড় ব্যর্থতা। এছাড়া দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মতো অভিযোগও তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পিছু ছাড়েনি।
পরবর্তী ধাপ: রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
ইরাকের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী, পার্লামেন্টে স্পিকার নির্বাচনের কাজ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নূরী আল-মালিকিকে নতুন সরকার বা ক্যাবিনেট (Cabinet) গঠনের আহ্বান জানাবেন।
মালিকির সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন করা, যা সুন্নি ও কুর্দিদের আস্থা অর্জন করতে পারবে। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার মাঝে ইরাকের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং ধসে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠন করাই হবে তাঁর প্রধান ‘অ্যাজেন্ডা’ (Agenda)। দীর্ঘ এক দশকের বিরতি দিয়ে ক্ষমতায় ফিরে মালিকি কি পারবেন ইরাকের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখতে, নাকি পুরনো বিতর্কই তাঁর পথ আগলে দাঁড়াবে—সেই উত্তর দেবে সময়।